১০:১৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৪ জানুয়ারী ২০২৬, ১ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

এআই এবং মানুষের চিন্তাশক্তি-গবেষণায় উঠছে উদ্বেগ ও সম্ভাবনা

এআই এবংমানুষের চিন্তাশক্তিঃ নতুন গবেষণায় উঠছে উদ্বেগ ও সম্ভাবনা

প্রবন্ধ লেখা, ডেটা বিশ্লেষণ কিংবা কভার লেটার যাচাই—দৈনন্দিন জীবনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এখন অনেকেরই নির্ভরযোগ্য সহকারী। সময় বাঁচানো ও কাজের গতি বাড়ানোর ক্ষেত্রে এর কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহ নেই। তবে এই সুবিধার আড়ালে মানুষের চিন্তাশক্তি ও শেখার দক্ষতা ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কি না—সে প্রশ্ন নতুন করে সামনে এনেছে সাম্প্রতিক একাধিক গবেষণা।

চলতি বছরের শুরুতে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (MIT) প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, যারা চ্যাটজিপিটির সহায়তায় প্রবন্ধ লিখেছেন, তাদের মস্তিষ্কে জ্ঞানীয় প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত নেটওয়ার্কগুলোর কার্যকলাপ তুলনামূলকভাবে কম ছিল। একই সঙ্গে, এআই ব্যবহারকারীরা নিজেদের লেখা প্রবন্ধ থেকে তথ্য বা উদ্ধৃতি দিতে তুলনামূলকভাবে কম পারদর্শী ছিলেন। গবেষকদের মতে, এই প্রবণতা শেখার গভীরতা কমে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়।

গবেষণাটিতে MIT ও আশপাশের বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৪ জন অংশগ্রহণকারীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ইলেক্ট্রোএনসেফালোগ্রাফি (EEG) প্রযুক্তির মাধ্যমে তাদের মস্তিষ্কের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করা হয়। অংশগ্রহণকারীরা প্রবন্ধের প্রশ্ন সংক্ষেপ করা, উৎস খোঁজা, ব্যাকরণ সংশোধন এবং লেখার ভঙ্গি উন্নত করার মতো কাজে এআইয়ের সহায়তা নেন। ফলাফলে দেখা যায়, এআই যত বেশি কাজ করেছে, মানুষের নিজস্ব চিন্তাশীল অংশগ্রহণ তত কমেছে।

একই ধরনের উদ্বেগ উঠে এসেছে কার্নেগি মেলন ইউনিভার্সিটি ও মাইক্রোসফটের (কপাইলট) যৌথ গবেষণায়। সেখানে প্রতি সপ্তাহে অন্তত একবার কাজে এআই ব্যবহার করেন—এমন ৩১৯ জন হোয়াইট-কলার কর্মীর ওপর জরিপ চালানো হয়। গবেষকেরা দেখতে পান, কোনো কাজে এআইয়ের সক্ষমতার ওপর যত বেশি আস্থা রাখা হয়েছে, তত কম স্বাধীনভাবে চিন্তা ও বিশ্লেষণের প্রবণতা দেখা গেছে।

গবেষকেরা সতর্ক করে বলছেন, জেনারেটিভ এআই স্বল্পমেয়াদে উৎপাদনশীলতা ও দক্ষতা বাড়ালেও দীর্ঘমেয়াদে মানুষের সমস্যা সমাধান ও সমালোচনামূলক চিন্তার ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ, কাজের ফল ভালো হলেও শেখার প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

শিক্ষা ক্ষেত্রেও একই ধরনের দ্বিমুখী চিত্র সামনে এসেছে। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস (OUP) পরিচালিত এক জরিপে যুক্তরাজ্যের স্কুলশিক্ষার্থীদের মধ্যে ১০ জনে ৬ জন মনে করে, এআই তাদের পড়াশোনাসংশ্লিষ্ট দক্ষতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তবে একই জরিপে আবার দেখা যায়, প্রতি ১০ জনে ৯ জন শিক্ষার্থী মনে করে, এআই অন্তত একটি দক্ষতা—যেমন সমস্যা সমাধান, সৃজনশীলতা বা রিভিশন—উন্নত করেছে।

OUP-এর জেনারেটিভ এআই বিশেষজ্ঞ ড. আলেক্সান্দ্রা টোমেস্কু বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত জটিল। একদিকে এআই শেখাকে সহজ ও দ্রুত করছে, অন্যদিকে অনেক শিক্ষার্থীর কাছে কাজ “অতিরিক্ত সহজ” হয়ে যাচ্ছে, যা গভীর ও টেকসই শেখাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের (UCL) অধ্যাপক ওয়েন হোমস এ পরিস্থিতিকে “কগনিটিভ অ্যাট্রফি” বা মানসিক দক্ষতা ক্ষয়ের ঝুঁকির সঙ্গে তুলনা করেন। তাঁর মতে, এআই ব্যবহারে আউটপুট ভালো হলেও শেখার মান খারাপ হতে পারে। “একজন শিক্ষার্থী ভালো নম্বর পেতে পারে, কিন্তু সে কি সত্যিই শিখছে?”—এই প্রশ্নটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি।

তবে এআই নির্মাতাদের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন। ওপেনএআইয়ের আন্তর্জাতিক শিক্ষা বিভাগের প্রধান জয়না দেবানি বলেন, চ্যাটজিপিটিকে কখনোই কাজ আউটসোর্স করার যন্ত্র হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং এটি একজন টিউটরের মতো ব্যবহার করলে শেখার গতি বাড়তে পারে। লক্ষ্যভিত্তিক ও সচেতন ব্যবহারে এআই শিক্ষার্থীদের জন্য কার্যকর সহায়ক হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

বিশেষজ্ঞদের সামগ্রিক অভিমত হলো, এআইকে পুরোপুরি বর্জন নয়—বরং এর সীমাবদ্ধতা, যুক্তি ও প্রভাব সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি। তথ্য যাচাই করা, নিজস্ব চিন্তা প্রয়োগ করা এবং শেখার মূল দায়িত্ব নিজের কাছেই রেখে এআই ব্যবহার করলেই এটি হতে পারে সহায়ক, ক্ষতিকর নয়।

সূত্রঃ বিবিসি

ট্যাগ

এআই এবং মানুষের চিন্তাশক্তি-গবেষণায় উঠছে উদ্বেগ ও সম্ভাবনা

প্রকাশিত হয়েছে: ১১:১১:৫৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫

প্রবন্ধ লেখা, ডেটা বিশ্লেষণ কিংবা কভার লেটার যাচাই—দৈনন্দিন জীবনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এখন অনেকেরই নির্ভরযোগ্য সহকারী। সময় বাঁচানো ও কাজের গতি বাড়ানোর ক্ষেত্রে এর কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহ নেই। তবে এই সুবিধার আড়ালে মানুষের চিন্তাশক্তি ও শেখার দক্ষতা ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কি না—সে প্রশ্ন নতুন করে সামনে এনেছে সাম্প্রতিক একাধিক গবেষণা।

চলতি বছরের শুরুতে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (MIT) প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, যারা চ্যাটজিপিটির সহায়তায় প্রবন্ধ লিখেছেন, তাদের মস্তিষ্কে জ্ঞানীয় প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত নেটওয়ার্কগুলোর কার্যকলাপ তুলনামূলকভাবে কম ছিল। একই সঙ্গে, এআই ব্যবহারকারীরা নিজেদের লেখা প্রবন্ধ থেকে তথ্য বা উদ্ধৃতি দিতে তুলনামূলকভাবে কম পারদর্শী ছিলেন। গবেষকদের মতে, এই প্রবণতা শেখার গভীরতা কমে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়।

গবেষণাটিতে MIT ও আশপাশের বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৪ জন অংশগ্রহণকারীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ইলেক্ট্রোএনসেফালোগ্রাফি (EEG) প্রযুক্তির মাধ্যমে তাদের মস্তিষ্কের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করা হয়। অংশগ্রহণকারীরা প্রবন্ধের প্রশ্ন সংক্ষেপ করা, উৎস খোঁজা, ব্যাকরণ সংশোধন এবং লেখার ভঙ্গি উন্নত করার মতো কাজে এআইয়ের সহায়তা নেন। ফলাফলে দেখা যায়, এআই যত বেশি কাজ করেছে, মানুষের নিজস্ব চিন্তাশীল অংশগ্রহণ তত কমেছে।

একই ধরনের উদ্বেগ উঠে এসেছে কার্নেগি মেলন ইউনিভার্সিটি ও মাইক্রোসফটের (কপাইলট) যৌথ গবেষণায়। সেখানে প্রতি সপ্তাহে অন্তত একবার কাজে এআই ব্যবহার করেন—এমন ৩১৯ জন হোয়াইট-কলার কর্মীর ওপর জরিপ চালানো হয়। গবেষকেরা দেখতে পান, কোনো কাজে এআইয়ের সক্ষমতার ওপর যত বেশি আস্থা রাখা হয়েছে, তত কম স্বাধীনভাবে চিন্তা ও বিশ্লেষণের প্রবণতা দেখা গেছে।

গবেষকেরা সতর্ক করে বলছেন, জেনারেটিভ এআই স্বল্পমেয়াদে উৎপাদনশীলতা ও দক্ষতা বাড়ালেও দীর্ঘমেয়াদে মানুষের সমস্যা সমাধান ও সমালোচনামূলক চিন্তার ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ, কাজের ফল ভালো হলেও শেখার প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

শিক্ষা ক্ষেত্রেও একই ধরনের দ্বিমুখী চিত্র সামনে এসেছে। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস (OUP) পরিচালিত এক জরিপে যুক্তরাজ্যের স্কুলশিক্ষার্থীদের মধ্যে ১০ জনে ৬ জন মনে করে, এআই তাদের পড়াশোনাসংশ্লিষ্ট দক্ষতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তবে একই জরিপে আবার দেখা যায়, প্রতি ১০ জনে ৯ জন শিক্ষার্থী মনে করে, এআই অন্তত একটি দক্ষতা—যেমন সমস্যা সমাধান, সৃজনশীলতা বা রিভিশন—উন্নত করেছে।

OUP-এর জেনারেটিভ এআই বিশেষজ্ঞ ড. আলেক্সান্দ্রা টোমেস্কু বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত জটিল। একদিকে এআই শেখাকে সহজ ও দ্রুত করছে, অন্যদিকে অনেক শিক্ষার্থীর কাছে কাজ “অতিরিক্ত সহজ” হয়ে যাচ্ছে, যা গভীর ও টেকসই শেখাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের (UCL) অধ্যাপক ওয়েন হোমস এ পরিস্থিতিকে “কগনিটিভ অ্যাট্রফি” বা মানসিক দক্ষতা ক্ষয়ের ঝুঁকির সঙ্গে তুলনা করেন। তাঁর মতে, এআই ব্যবহারে আউটপুট ভালো হলেও শেখার মান খারাপ হতে পারে। “একজন শিক্ষার্থী ভালো নম্বর পেতে পারে, কিন্তু সে কি সত্যিই শিখছে?”—এই প্রশ্নটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি।

তবে এআই নির্মাতাদের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন। ওপেনএআইয়ের আন্তর্জাতিক শিক্ষা বিভাগের প্রধান জয়না দেবানি বলেন, চ্যাটজিপিটিকে কখনোই কাজ আউটসোর্স করার যন্ত্র হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং এটি একজন টিউটরের মতো ব্যবহার করলে শেখার গতি বাড়তে পারে। লক্ষ্যভিত্তিক ও সচেতন ব্যবহারে এআই শিক্ষার্থীদের জন্য কার্যকর সহায়ক হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

বিশেষজ্ঞদের সামগ্রিক অভিমত হলো, এআইকে পুরোপুরি বর্জন নয়—বরং এর সীমাবদ্ধতা, যুক্তি ও প্রভাব সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি। তথ্য যাচাই করা, নিজস্ব চিন্তা প্রয়োগ করা এবং শেখার মূল দায়িত্ব নিজের কাছেই রেখে এআই ব্যবহার করলেই এটি হতে পারে সহায়ক, ক্ষতিকর নয়।

সূত্রঃ বিবিসি