১২:০৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ১ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

কারাগার থেকে হাসপাতাল—নীরব সঙ্গীর বিদায়

রাজনীতির কোলাহলমুখর ইতিহাসে যাদের নাম খুব কমই উচ্চারিত হয়, সেই নীরব মানুষের একজন ছিলেন ফাতেমা বেগম। বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দীর্ঘ দেড় দশকের ছায়াসঙ্গী ফাতেমাকে চিরবিদায় জানিয়েছেন তিনি। এভারকেয়ার হাসপাতালে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত খালেদা জিয়ার সঙ্গেই ছিলেন ফাতেমা।

গৃহকর্মীর পরিচয়ের গণ্ডি পেরিয়ে ফাতেমা বেগম হয়ে উঠেছিলেন খালেদা জিয়ার একান্ত আপন মানুষ। কারাবাস, গৃহবন্দিত্ব, হাসপাতালের দীর্ঘ রাত কিংবা বিদেশে চিকিৎসার নিঃসঙ্গ সময়—সবখানেই নিঃশব্দে পাশে ছিলেন তিনি। রাজনীতির কোনো পদ-পদবি না থাকলেও কঠিন সময়গুলোয় তার উপস্থিতি ছিল অবিচ্ছেদ্য।

ফাতেমা বেগমের জন্ম ভোলার সদর উপজেলার কাচিয়া ইউনিয়নের শাহ-মাদার গ্রামে। অল্প বয়সেই সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে হয় তাকে। স্বামী হারুন লাহাড়ির অকাল মৃত্যুর পর দুই ছোট সন্তান নিয়ে জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হন তিনি। জীবিকার তাগিদে সন্তানদের গ্রামে রেখে ঢাকায় এসে কাজ খুঁজতে বাধ্য হন ফাতেমা।

২০০৯ সালে খালেদা জিয়ার বাসভবনে কাজ শুরু করার মধ্য দিয়ে শুরু হয় এই দীর্ঘ সহযাত্রা। সময়ের সঙ্গে দায়িত্বের সম্পর্ক রূপ নেয় নির্ভরতার বন্ধনে। শারীরিক অসুস্থতায় ওষুধ খাওয়ানো থেকে শুরু করে হাঁটতে না পারলে হাত ধরে রাখা—সবই ছিল তার নীরব দায়িত্ব।

২০১৪ সালের ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ কর্মসূচির সময় ফিরোজার সামনে পুলিশের বাধার মুখে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় খালেদা জিয়াকে শক্ত করে ধরে রাখার সেই দৃশ্য ক্যামেরায় ধরা পড়ে। রাজনৈতিক উত্তাপের ভিড়েও মানবিকতার এক স্থির ছবি হয়ে ওঠেন ফাতেমা।

২০১৮ সালে খালেদা জিয়া কারাবন্দি হলে আদালতের অনুমতিতে কারাগারেও তার সঙ্গে ছিলেন ফাতেমা। কোনো রাজনৈতিক পরিচয় ছাড়াই তিনি স্বেচ্ছায় বন্দিজীবন বেছে নেন, কারণ সেই সময় একা থাকা মানেই ভেঙে পড়া—এ কথা তিনি বুঝতেন।

করোনাকালে ২০২১ সালে ৫৩ দিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায়ও খালেদা জিয়ার পাশে অবিচল ছিলেন ফাতেমা। যখন অনেকেই ভয় আর শঙ্কায় দূরে সরে গিয়েছিলেন, তখন তিনি ছিলেন সেবিকা, সাহস আর আশ্রয়।

সর্বশেষ লন্ডনে উন্নত চিকিৎসার সময় এবং দেশে ফিরে এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকাকালেও শেষ দিন পর্যন্ত পাশে ছিলেন এই নীরব ছায়াসঙ্গী। কোনো বক্তব্য নেই, নেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকার চেষ্টা—তবু রাজনীতির ইতিহাসে তার উপস্থিতি রয়ে গেছে ছায়ার মতোই গভীর।

ফাতেমা বেগম প্রমাণ করে গেছেন, সব সম্পর্ক ক্ষমতার নয়। কিছু সম্পর্ক গড়ে ওঠে দায়িত্ব, মানবিকতা আর নিঃশব্দ ভালোবাসা দিয়ে। রাজনীতির ভিড়ে তিনি হয়তো এক নীরব নাম, কিন্তু সেই নীরবতাই তাকে আলাদা করে চিহ্নিত করে ইতিহাসের পাতায়।

ট্যাগ

উন্নয়নের জন্য দল-মতের ঊর্ধ্বে ঐক্যের আহ্বান বিএনপি প্রার্থী হাবিবুর রশিদের

কারাগার থেকে হাসপাতাল—নীরব সঙ্গীর বিদায়

প্রকাশিত হয়েছে: ১০:৫৩:০০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ জানুয়ারী ২০২৬

রাজনীতির কোলাহলমুখর ইতিহাসে যাদের নাম খুব কমই উচ্চারিত হয়, সেই নীরব মানুষের একজন ছিলেন ফাতেমা বেগম। বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দীর্ঘ দেড় দশকের ছায়াসঙ্গী ফাতেমাকে চিরবিদায় জানিয়েছেন তিনি। এভারকেয়ার হাসপাতালে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত খালেদা জিয়ার সঙ্গেই ছিলেন ফাতেমা।

গৃহকর্মীর পরিচয়ের গণ্ডি পেরিয়ে ফাতেমা বেগম হয়ে উঠেছিলেন খালেদা জিয়ার একান্ত আপন মানুষ। কারাবাস, গৃহবন্দিত্ব, হাসপাতালের দীর্ঘ রাত কিংবা বিদেশে চিকিৎসার নিঃসঙ্গ সময়—সবখানেই নিঃশব্দে পাশে ছিলেন তিনি। রাজনীতির কোনো পদ-পদবি না থাকলেও কঠিন সময়গুলোয় তার উপস্থিতি ছিল অবিচ্ছেদ্য।

ফাতেমা বেগমের জন্ম ভোলার সদর উপজেলার কাচিয়া ইউনিয়নের শাহ-মাদার গ্রামে। অল্প বয়সেই সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে হয় তাকে। স্বামী হারুন লাহাড়ির অকাল মৃত্যুর পর দুই ছোট সন্তান নিয়ে জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হন তিনি। জীবিকার তাগিদে সন্তানদের গ্রামে রেখে ঢাকায় এসে কাজ খুঁজতে বাধ্য হন ফাতেমা।

২০০৯ সালে খালেদা জিয়ার বাসভবনে কাজ শুরু করার মধ্য দিয়ে শুরু হয় এই দীর্ঘ সহযাত্রা। সময়ের সঙ্গে দায়িত্বের সম্পর্ক রূপ নেয় নির্ভরতার বন্ধনে। শারীরিক অসুস্থতায় ওষুধ খাওয়ানো থেকে শুরু করে হাঁটতে না পারলে হাত ধরে রাখা—সবই ছিল তার নীরব দায়িত্ব।

২০১৪ সালের ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ কর্মসূচির সময় ফিরোজার সামনে পুলিশের বাধার মুখে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় খালেদা জিয়াকে শক্ত করে ধরে রাখার সেই দৃশ্য ক্যামেরায় ধরা পড়ে। রাজনৈতিক উত্তাপের ভিড়েও মানবিকতার এক স্থির ছবি হয়ে ওঠেন ফাতেমা।

২০১৮ সালে খালেদা জিয়া কারাবন্দি হলে আদালতের অনুমতিতে কারাগারেও তার সঙ্গে ছিলেন ফাতেমা। কোনো রাজনৈতিক পরিচয় ছাড়াই তিনি স্বেচ্ছায় বন্দিজীবন বেছে নেন, কারণ সেই সময় একা থাকা মানেই ভেঙে পড়া—এ কথা তিনি বুঝতেন।

করোনাকালে ২০২১ সালে ৫৩ দিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায়ও খালেদা জিয়ার পাশে অবিচল ছিলেন ফাতেমা। যখন অনেকেই ভয় আর শঙ্কায় দূরে সরে গিয়েছিলেন, তখন তিনি ছিলেন সেবিকা, সাহস আর আশ্রয়।

সর্বশেষ লন্ডনে উন্নত চিকিৎসার সময় এবং দেশে ফিরে এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকাকালেও শেষ দিন পর্যন্ত পাশে ছিলেন এই নীরব ছায়াসঙ্গী। কোনো বক্তব্য নেই, নেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকার চেষ্টা—তবু রাজনীতির ইতিহাসে তার উপস্থিতি রয়ে গেছে ছায়ার মতোই গভীর।

ফাতেমা বেগম প্রমাণ করে গেছেন, সব সম্পর্ক ক্ষমতার নয়। কিছু সম্পর্ক গড়ে ওঠে দায়িত্ব, মানবিকতা আর নিঃশব্দ ভালোবাসা দিয়ে। রাজনীতির ভিড়ে তিনি হয়তো এক নীরব নাম, কিন্তু সেই নীরবতাই তাকে আলাদা করে চিহ্নিত করে ইতিহাসের পাতায়।