
সময়ের স্রোতে আরও একটি বছর ইতিহাসের পাতায় যুক্ত হলো। মধ্যরাত পেরিয়ে বিদায় নিল ২০২৫ সাল, সূচনা হলো ২০২৬-এর। নতুন বছরের সূর্য আশার বার্তা নিয়ে এলেও বিদায়ী বছরটি রেখে গেছে রাজনৈতিক নাটকীয়তা, রাষ্ট্র সংস্কারের টানাপোড়েন, গণআন্দোলনের স্মৃতি এবং শোকের দীর্ঘ ছায়া। এসব ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশ প্রবেশ করল একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী বছরে।
বাংলাদেশের জন্য ২০২৬ সাল কেবল নতুন ক্যালেন্ডার নয়; এটি এক কঠিন পরীক্ষার সময়। কারণ, সামনে রয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচন ঘিরেই আগামী দিনের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, গণতান্ত্রিক উত্তরণ এবং রাষ্ট্র সংস্কারের ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ধারিত হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
২০২৫ সালের শুরুতেই রাষ্ট্র সংস্কারের অঙ্গীকার সামনে আসে। ১৭ জানুয়ারি জাতির উদ্দেশে ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন। পুলিশ, বিচার বিভাগ ও নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কার কমিশন মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করে। একই মাসে উচ্চ আদালতের রায়ে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় বেগম খালেদা জিয়ার সাজা বাতিল হয় এবং দীর্ঘ সাড়ে ১৭ বছর পর কারামুক্ত হন সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর।
ফেব্রুয়ারিতে দেশের নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক অঙ্গনে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। অপরাধ দমনে যৌথ বাহিনীর ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ শুরু হলে ব্যাপক গ্রেপ্তার অভিযান চলে। একই সময়ে জুলাই অভ্যুত্থান নিয়ে জাতিসংঘের প্রতিবেদন প্রকাশ এবং প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক টানাপোড়েন আলোচনায় আসে। এই মাসেই আত্মপ্রকাশ করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’।
মার্চ ও এপ্রিলে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। রমজানকে কেন্দ্র করে বাজার পরিস্থিতি সামাল দিতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ সময় বিতর্কিত বিদ্যুৎ চুক্তি পুনর্বিবেচনায় উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন এবং সাইবার নিরাপত্তা আইন বাতিল করে নতুন সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ জারি করা হয়। পাশাপাশি বিনিয়োগ সম্মেলন ও পাকিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ নতুন আলোচনার জন্ম দেয়।
মে মাসে রাজনীতিতে আসে বড় মোড়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের নির্দেশে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের কার্যক্রম স্থগিত করা হয়। একই মাসে দীর্ঘ চিকিৎসা শেষে লন্ডন থেকে দেশে ফেরেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। তবে মব ভায়োলেন্স, ঘূর্ণিঝড় ও ভূমিধস রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মানবিক সংকট সৃষ্টি করে।
জুনে জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করা হলেও জুলাই মাস জাতির জন্য বেদনাবিধুর হয়ে ওঠে। ঢাকার উত্তরায় প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হয়ে বহু প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। পাশাপাশি সাবেক প্রধান বিচারপতির গ্রেপ্তার রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্ক তৈরি করে।
আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের এক বছর পূর্তি পালিত হয়। অক্টোবর ও নভেম্বরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়, সংবিধানে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার প্রত্যাবর্তন এবং বিমানবন্দরের অগ্নিকাণ্ড দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়।
ডিসেম্বর মাস ছিল শোক ও গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণায় ভরা। নির্বাচন কমিশন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে, ভোটের দিন নির্ধারণ হয় ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি। ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড দেশকে নাড়া দেয়। দীর্ঘ নির্বাসন শেষে দেশে ফেরেন তারেক রহমান। বছরের শেষপ্রান্তে জাতি হারায় প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে। লাখো মানুষের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হয় তার জানাজা।
ঘটনাবহুল ২০২৫ পেছনে ফেলে বাংলাদেশ এখন ২০২৬-এর পথে। নতুন বছরে অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন। একই দিনে জুলাই ঘোষণার ভিত্তিতে গণভোট, আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ এবং দ্রব্যমূল্য সহনীয় রাখা—সব মিলিয়ে ২০২৬ সাল হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের জন্য গণতন্ত্র ও রাষ্ট্র পরিচালনার এক কঠিন পরীক্ষা।
সমাচার বিশ্ব নিউজ ডেক্স 

















