
রাজনৈতিক টানাপোড়েন, অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও সামাজিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ২০২৫ সাল শেষ হয়েছে। নতুন বছর ২০২৬ শুরু হচ্ছে বড় প্রত্যাশা ও নানা অনিশ্চয়তা নিয়ে। সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু—১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনকে ঘিরেই দেশের রাজনীতি, প্রশাসন ও নাগরিক আলোচনার মূল সুর আবর্তিত হচ্ছে।
২০২৫ সালজুড়ে নির্বাচন ছিল দেশের রাজনীতির সবচেয়ে আলোচিত ও সংবেদনশীল বিষয়। জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান, আন্দোলন-সমাবেশ এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস রাজনৈতিক পরিবেশকে উত্তপ্ত করে তোলে। নির্বাচন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, অংশগ্রহণমূলক ভোট এবং গণতান্ত্রিক চর্চা নিশ্চিত করার প্রশ্নে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের দাবি ছিল জোরালো।
নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রশাসনিক প্রস্তুতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়েও বিস্তর আলোচনা হয়েছে। অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজনের সক্ষমতা নিয়ে যেমন আশাবাদ রয়েছে, তেমনি রয়েছে শঙ্কাও। রাজনীতিতে সহনশীলতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সহিংসতামুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান বারবার উঠে এসেছে।
অন্যদিকে, অর্থনৈতিক দিক থেকে ২০২৫ ছিল চাপের একটি বছর। মূল্যস্ফীতি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তোলে। বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং টাকার মান কমে যাওয়ার প্রভাব পড়ে বাজার ও বিনিয়োগ খাতে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার বিভিন্ন নীতি ও সংস্কারমূলক উদ্যোগ গ্রহণ করে।
এই কঠিন পরিস্থিতিতেও প্রবাসী আয় দেশের অর্থনীতিতে স্বস্তি এনে দিয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও রেমিট্যান্সের ধারাবাহিক প্রবাহ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধরে রাখতে সহায়ক হয়েছে। রেমিট্যান্সের প্রভাব শুধু কেন্দ্রীয় অর্থনীতিতে নয়, গ্রামীণ অর্থনীতি সচল রাখা, দারিদ্র্য হ্রাস ও পারিবারিক আয় বৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি ডিসেম্বরে ২৯ দিনে দেশে এসেছে প্রায় ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রবাসী আয়। এতে ডলার সংকট কিছুটা লাঘব হয়েছে। ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের গ্রস রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৩ দশমিক ১৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিপিএম–৬ পদ্ধতি অনুযায়ী রিজার্ভের পরিমাণ ২৮ দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলার।
এর আগে ২০২১ সালের আগস্টে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সর্বোচ্চ ৪৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল। তবে পরবর্তীতে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধি, টাকার অবমূল্যায়ন এবং চলতি হিসাব ঘাটতির কারণে রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়। সংকট মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার বিক্রি শুরু করলে রিজার্ভ ধীরে ধীরে কমতে থাকে।
সামাজিক ক্ষেত্রেও মানুষের প্রত্যাশা বেড়েছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি এখন জনআলোচনার কেন্দ্রে। তরুণ সমাজের বড় অংশ দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগের দিকে তাকিয়ে আছে। ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ, স্টার্টআপ সংস্কৃতি ও নতুন উদ্যোগ ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনার দিক নির্দেশ করছে।
সব মিলিয়ে ২০২৬ সাল বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। জাতীয় নির্বাচন, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা—এই তিনটি বিষয়ই নতুন বছরের গতিপথ নির্ধারণ করবে। ২০২৫ সালের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সামনে এগোতে পারলে ২০২৬ সাল বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে।
নাতাশা মুন্নি 

















