
গভীর সমুদ্রে সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ ও ইকোসিস্টেম সংরক্ষণে গবেষণা জোরদার এবং বিদ্যমান সমস্যাগুলো চিহ্নিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন প্রধান উপদেষ্টা। গবেষণা জাহাজ R.V. Dr. Fridtjof Nansen কর্তৃক পরিচালিত সামুদ্রিক জরিপ ও গবেষণা প্রতিবেদন আজ তার কাছে জমা দিয়েছে সংশ্লিষ্ট কমিটি।
মঙ্গলবার সকালে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় অনুষ্ঠিত এ সভায় উপস্থিত ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার, প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্সেস-এর অধ্যাপক সায়েদুর রহমান চৌধুরী এবং মৎস্য অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ড. মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন।
সভায় জানানো হয়, গত বছরের ২১ আগস্ট থেকে ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক মাসব্যাপী এ জরিপ পরিচালিত হয়। আটটি দেশের ২৫ জন বিজ্ঞানী এতে অংশ নেন, যার মধ্যে ১৩ জন ছিলেন বাংলাদেশের। জরিপে বাংলাদেশের গভীর সমুদ্র এলাকার জীববৈচিত্র্য, মাছের প্রাচুর্য ও পরিবেশগত পরিবর্তন বিশ্লেষণ করা হয়।
অধ্যাপক সায়েদুর রহমান চৌধুরী বৈঠকে গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উপস্থাপন করে জানান, এ গবেষণায় ৬৫টি নতুন জলজ প্রাণীর প্রজাতির অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। তবে একই সঙ্গে গভীর সমুদ্রে জেলিফিশের অস্বাভাবিক আধিক্য লক্ষ্য করা গেছে, যা সামুদ্রিক ইকোসিস্টেমের ভারসাম্যহীনতার স্পষ্ট ইঙ্গিত। তার মতে, অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত মাছ ধরাই এই পরিস্থিতির মূল কারণ।
গবেষণায় আরও উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য। দুই হাজার মিটার গভীরতায়ও প্লাস্টিক বর্জ্যের উপস্থিতি পাওয়া গেছে, যা গভীর সমুদ্রের পরিবেশ দূষণের মাত্রা বাড়ার প্রমাণ। পাশাপাশি ২০১৮ সালের গবেষণার সঙ্গে তুলনা করে দেখা গেছে, গভীর সমুদ্রে বড় আকারের মাছ কমে যাচ্ছে এবং স্বল্প গভীর পানিতে মাছের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে।
সভায় জানানো হয়, বর্তমানে গভীর সমুদ্রে ২৭০ থেকে ২৮০টি বড় ফিশিং ট্রলার মাছ আহরণ করছে। এর মধ্যে প্রায় ৭০টি ট্রলার সোনার প্রযুক্তি ব্যবহার করে টার্গেটেড ফিশিংয়ে যুক্ত রয়েছে, যা অত্যন্ত আগ্রাসী পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত। এতে গভীর সমুদ্রে বড় মাছ ধরায় কিছু ট্রলার লাভবান হলেও, স্বল্প গভীর পানিতে মাছ ধরায় নিয়োজিত জেলেরা মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
এ বিষয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেন, এভাবে টার্গেটেড ফিশিং চলতে থাকলে বঙ্গোপসাগর মাছশূন্য হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সোনার ফিশিং বিষয়ে সরকার শিগগিরই নীতিগত সিদ্ধান্ত নেবে বলেও তিনি জানান।
গবেষণায় বাংলাদেশের ডিপ সি ফিশিং এলাকায় টুনা মাছের আধিক্য ও সম্ভাবনার কথাও উঠে এসেছে। একই সঙ্গে সুন্দরবনের নিচে একটি গুরুত্বপূর্ণ ফিশিং নার্সারির সন্ধান পাওয়া গেছে, যা সংরক্ষণের জন্য ইতোমধ্যেই সরকারের পক্ষ থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, দেশের স্থলভাগের সমপরিমাণ জলভাগ থাকা সত্ত্বেও এই সামুদ্রিক সম্পদ যথাযথভাবে কাজে লাগানো হয়নি। এমনকি সম্পদের প্রকৃত পরিমাণ ও সম্ভাবনাও এতদিন পুরোপুরি জানা যায়নি। তিনি বলেন, এসব সম্পদ কাজে লাগাতে হলে পর্যাপ্ত গবেষণা, তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা এবং কার্যকর নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন।
সভায় আরও জানানো হয়, যুক্তরাজ্যের রয়্যাল নেভির বহুমুখী হাইড্রোগ্রাফিক ও ওশেনোগ্রাফিক সার্ভে ভেসেল এইচএমএস এন্টারপ্রাইজ বাংলাদেশ নৌবাহিনীর কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। ভেসেলটি সমুদ্রের তলদেশ, গভীরতা ও অন্যান্য সামুদ্রিক তথ্য সংগ্রহ করবে, যা বাংলাদেশের সামুদ্রিক গবেষণা সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এছাড়া জাপান, ইন্দোনেশিয়া ও মালদ্বীপের সঙ্গে যৌথ গবেষণা ও সমন্বয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেন প্রধান উপদেষ্টা। তিনি বলেন, সমস্যাগুলো সঠিকভাবে চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে গবেষণা সমন্বয়ের মাধ্যমেই সামুদ্রিক অর্থনীতির নতুন দিগন্ত উন্মোচন সম্ভব।
সমাচার বিশ্ব নিউজ ডেক্স 


















