০২:১৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৬ মার্চ ২০২৬, ২২ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

আল-হাইয়্যু: চিরঞ্জীব আল্লাহ ও জীবনের চূড়ান্ত উৎস

আল-হাইয়্যু: চিরঞ্জীব আল্লাহ ও জীবনের চূড়ান্ত উৎস

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা একাধিক স্থানে নিজেকে ٱلْحَىُّ (আল-হাইয়্যু)—অর্থাৎ চিরঞ্জীব হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী, আল-হাইয়্যু এমন এক সত্তা যাঁর জীবন চিরন্তন, অমর এবং সম্পূর্ণ স্বয়ংসম্পূর্ণ। তাঁর জীবনের কোনো শুরু নেই, কোনো শেষ নেই। সমস্ত সৃষ্ট জীবনের উৎস তিনি নিজেই, এবং শেষ পর্যন্ত প্রতিটি জীবন তাঁর কাছেই প্রত্যাবর্তন করবে।

আরবি ح-ى-ى (হা-ইয়া-ইয়া) মূল ধাতু থেকে ‘হাইয়্যু’ শব্দটি এসেছে। এই মূল ধাতু চারটি গভীর অর্থ বহন করে—বেঁচে থাকা, স্পষ্ট বা প্রকাশিত হওয়া, পুনরুজ্জীবিত হওয়া ও পরিপূর্ণতা অর্জন করা। কুরআনে এই ধাতু থেকে উদ্ভূত শব্দ প্রায় ১৮৪ বার এসেছে, যা আল্লাহর জীবনদাতা সত্তা ও জীবনের গতিশীলতাকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।

ইসলামি আকিদা অনুযায়ী, আল-হাইয়্যুর জীবন মানুষের জীবনের মতো নয়। মানুষের জীবন সীমাবদ্ধ, অপূর্ণ এবং নির্ভরশীল; কিন্তু আল্লাহর জীবন পরিপূর্ণ ও নির্ভরহীন। তিনি নিজে জীবিত এবং অন্য সবাইকে জীবন দানকারী। তাঁর শ্রবণ, দৃষ্টি, জ্ঞান ও ক্ষমতা সবই নিখুঁত, কারণ এগুলো নিখুঁত জীবনেরই অংশ। কুরআনে বারবার আল-হাইয়্যু নামটির সঙ্গে আল-কাইয়্যুম নামটি যুক্ত হয়ে এসেছে, যা নির্দেশ করে—তিনি শুধু জীবিত নন, বরং সমগ্র সৃষ্টি তাঁর দ্বারাই স্থিতিশীল।

কুরআনের ভাষায়, “চিরঞ্জীব চিরস্থায়ীর সামনে সকল মুখ অবনত হবে” এবং “মরবেন না—এমন চিরঞ্জীব সত্তার উপর ভরসা করো।” এই আয়াতগুলো মানুষের জীবনে একটি মৌলিক শিক্ষা দেয়—ক্ষমতা, সম্পদ বা মানুষের উপর নয়, বরং চিরঞ্জীব আল্লাহর উপরই প্রকৃত ভরসা স্থাপন করা উচিত।

ইসলামি শিক্ষায় আল-হাইয়্যু নামটি কেবল জ্ঞানগত নয়, বরং ব্যবহারিক দিকনির্দেশনাও দেয়। বিশ্বাসীদের বলা হয়েছে—এই নামের উপলব্ধি যেন তাদের কাজকর্মে প্রতিফলিত হয়। মানুষ হয়তো সবকিছু দেখে না, কিন্তু আল-হাইয়্যু তাঁর নিখুঁত জীবন ও গুণাবলীর মাধ্যমে সবকিছুই দেখেন ও জানেন। এই বিশ্বাস মানুষকে অন্যায় থেকে বিরত রাখে এবং সৎকর্মে অনুপ্রাণিত করে।

রাসুলুল্লাহ (ﷺ) কঠিন মুহূর্তে আল-হাইয়্যু ও আল-কাইয়্যুমের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করতেন। তাঁর শেখানো দোয়াগুলো মুসলমানদের দৈনন্দিন জীবনে আল্লাহর উপর নির্ভরতার এক শক্তিশালী প্রকাশ। বিশেষ করে সকাল-সন্ধ্যার দোয়াগুলোতে আল-হাইয়্যুর কাছে নিজের সমস্ত বিষয় সোপর্দ করার শিক্ষা রয়েছে।

ইসলামি আলেমদের মতে, আল-হাইয়্যু নামের গভীর উপলব্ধি মানুষের মনে সান্ত্বনা ও স্থিরতা আনে। যখন মানুষ নিজেকে একা, পরাভূত বা নিঃস্ব মনে করে, তখন এই বিশ্বাস তাকে মনে করিয়ে দেয়—চিরঞ্জীব আল্লাহ সবসময় উপস্থিত, সবকিছু জানেন এবং শেষ বিচারের দিন ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত করবেন।

সবশেষে বলা যায়, আল-হাইয়্যু নামটি মানুষকে জীবন সম্পর্কে একটি মৌলিক সত্য শেখায়—সবকিছু ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু আল্লাহ চিরস্থায়ী। আর এই চিরঞ্জীব সত্তার দিকেই মানুষের চূড়ান্ত প্রত্যাবর্তন।

ট্যাগ

সৌদি আরব ও কুয়েত লক্ষ্য করে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ

সৌদি আরব ও কুয়েত লক্ষ্য করে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার নতুন অধ্যায় তৈরি হয়েছে। সৌদি আরব ও কুয়েতকে লক্ষ্য করে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে ইরান বলে অভিযোগ উঠেছে। শুক্রবার মধ্যরাতের পর এসব মিসাইল ছোড়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে সৌদি আরব ও কুয়েত উভয় দেশই জানিয়েছে, তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হামলাগুলো সফলভাবে প্রতিহত করেছে। সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী রিয়াদের কাছে অবস্থিত প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিকে লক্ষ্য করে তিনটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়। কিন্তু লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছানোর আগেই সৌদি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মিসাইলগুলো ধ্বংস করে দেয়। এতে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে কুয়েতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, একটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র তাদের আকাশসীমায় প্রবেশ করেছিল। দ্রুত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করে সেটিকে ধ্বংস করা হয়। তবে প্রতিরক্ষা মিসাইলের ধ্বংসাবশেষ একটি এলাকায় পড়ে সামান্য ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে বলে জানানো হয়েছে। যদিও এতে বড় ধরনের কোনো ক্ষতি বা প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি। এদিকে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস জানিয়েছে, কুয়েতে অবস্থিত নিজেদের দূতাবাস আংশিক বা সম্পূর্ণ খালি করার প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে উপসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে মার্কিন ও মিত্র দেশগুলোর সামরিক উপস্থিতি এবং পাল্টাপাল্টি হুমকির কারণে পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

আরো পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ পড়ুন

বাহরাইনে ড্রোন হামলা, লক্ষ্য ছিল মার্কিন সেনাদের আবাসস্থল

বাহরাইনে ড্রোন হামলা, লক্ষ্য ছিল মার্কিন সেনাদের আবাসস্থল

মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশ বাহরাইনের রাজধানী মানামায় একটি হোটেলে ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। স্থানীয় ও আঞ্চলিক কয়েকটি অসমর্থিত সূত্রের দাবি, সেখানে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়েছে। ঘটনাটি ঘিরে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। খবরে বলা হয়েছে, হামলার আগে শুক্রবার বাংলাদেশ সময় সকাল ৬টার দিকে বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রাজধানীতে সতর্কতামূলক সাইরেন বাজানোর বিষয়টি নিশ্চিত করে। সে সময় কর্তৃপক্ষ নাগরিকদের পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত নিরাপদ স্থানে আশ্রয়ে থাকার আহ্বান জানায়। এতে বোঝা যায় যে সম্ভাব্য নিরাপত্তা হুমকি সম্পর্কে আগেই সতর্ক ছিল দেশটির প্রশাসন। স্থানীয় একটি সূত্রের বরাতে জানা গেছে, রাজধানী মানামার জুফফাইর এলাকায় অবস্থিত একটি হোটেল বা আবাসিক ভবন লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালানো হয়। ওই এলাকাতেই মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর অবস্থিত এবং সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের বহু সামরিক সদস্য অবস্থান করেন। ধারণা করা হচ্ছে, হামলার লক্ষ্য ছিল ওই নৌবহরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সেনাদের আবাসস্থল। তবে হামলার বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানায়নি বাহরাইনের সরকার বা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্তৃপক্ষ। হতাহতের কোনো তথ্যও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। একইভাবে ইরানের পক্ষ থেকেও এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই হামলার খবর নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি এবং ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক উত্তেজনার কারণে ঘটনাটিকে ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ...

আরো পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ পড়ুন

ইতিকাফে কী কী আমল করবেন?

ইতিকাফে কী কী আমল করবেন?

রমজান মাসের শেষ দশক মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বরকতময় সময়। এই সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হলো ইতিকাফ। ইতিকাফের অর্থ হলো দুনিয়ার ব্যস্ততা থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে মসজিদে অবস্থান করা এবং ইবাদতে মগ্ন থাকা। ইসলামী চিন্তাবিদরা বলেন, রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফে বসার সুযোগ পাওয়া একজন মুসলমানের জন্য বিরাট নেয়ামত। ইতিকাফের সময়টিকে সর্বোত্তমভাবে কাজে লাগাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো কুরআন তিলাওয়াত। অনেক মুসলমানই রমজানের প্রথম অংশে কাজ, ব্যবসা বা পারিবারিক ব্যস্ততার কারণে কুরআনের জন্য পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেন না। তাই শেষ দশকের এই সময়টিকে কুরআনের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ হিসেবে নেওয়া যায়। অনেকে চেষ্টা করেন এই দশ দিনের মধ্যেই অন্তত একবার কুরআন খতম করার। ইতিকাফের সময় আল্লাহর কাছে দোয়া করা এবং ইস্তিগফার করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আলেমদের মতে, এই সময়টি নিজের গুনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনার অন্যতম সেরা সুযোগ। ইতিকাফে বসে বেশি বেশি তওবা, ইস্তিগফার এবং কান্নাভেজা দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত। একই সঙ্গে নিজের পরিবার, সমাজ এবং সমগ্র মুসলিম উম্মাহর কল্যাণের জন্য দোয়া করা উত্তম। কারণ এই সময়ের কোনো রাত যদি লাইলাতুল কদর হয়ে যায়, তাহলে সেই দোয়া কবুল হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফের গুরুত্ব ও ফজিলত এছাড়া ইতিকাফের সময় বেশি বেশি নফল ইবাদত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। শুধু ফরজ...

আরো পড়ুন
ট্যাগ

পরবর্তী সংবাদ পড়ুন

রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফের গুরুত্ব ও ফজিলত

রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফের গুরুত্ব ও ফজিলত

রমজান মাসের শেষ দশকে মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ফজিলতপূর্ণ একটি ইবাদত হলো ইতিকাফ। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে দুনিয়ার সব ব্যস্ততা থেকে নিজেকে দূরে রেখে মসজিদে অবস্থান করে ইবাদতে নিমগ্ন থাকার এই আমলকে ইসলামে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আলেমরা বলেন, ইতিকাফ মানুষের আত্মশুদ্ধি, তাকওয়া অর্জন এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক অনন্য সুযোগ। ইতিকাফের মূল উদ্দেশ্য হলো দুনিয়াবি ব্যস্ততা থেকে দূরে সরে আল্লাহর ইবাদতে সম্পূর্ণ মনোযোগ দেওয়া। মানুষের দৈনন্দিন জীবনে পরিবার, সমাজ, কাজ এবং নানা দায়িত্বের কারণে অনেক সময় গভীরভাবে ইবাদতে মনোনিবেশ করা সম্ভব হয় না। ইতিকাফ সেই সুযোগকে উন্মুক্ত করে দেয়, যেখানে একজন মুসলমান নিরবচ্ছিন্নভাবে আল্লাহর স্মরণ, নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত এবং দোয়া-ইস্তিগফারে সময় ব্যয় করতে পারেন। ১৭ রমজান: বদর যুদ্ধের ঐতিহাসিক দিন। কুরআনুল কারিমেও ইতিকাফের উল্লেখ রয়েছে। সূরা আল-বাকারা ১২৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, তিনি হযরত ইবরাহিম (আ.) ও হযরত ইসমাঈল (আ.)-কে নির্দেশ দিয়েছিলেন যেন তাঁরা তাঁর ঘরকে তাওয়াফকারী, ইতিকাফকারী এবং রুকু-সিজদাকারীদের জন্য পবিত্র রাখেন। এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, ইতিকাফের বিধান ইসলামের প্রাচীন ঐতিহ্যের অংশ। হাদিসেও ইতিকাফের গুরুত্ব সম্পর্কে বহু বর্ণনা রয়েছে। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) মদিনায় হিজরতের পর প্রায় প্রতি বছরই রমজানের শেষ দশ দিন ইতিকাফ করতেন। একবার বিশেষ কারণে ইতিকাফ করতে না পারায় পরের বছর তিনি বিশ দিন ইতিকাফ করেছিলেন বলে হাদিসে উল্লেখ...

আরো পড়ুন
ট্যাগ

আল-হাইয়্যু: চিরঞ্জীব আল্লাহ ও জীবনের চূড়ান্ত উৎস

প্রকাশিত হয়েছে: ০৯:২৭:৪০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা একাধিক স্থানে নিজেকে ٱلْحَىُّ (আল-হাইয়্যু)—অর্থাৎ চিরঞ্জীব হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী, আল-হাইয়্যু এমন এক সত্তা যাঁর জীবন চিরন্তন, অমর এবং সম্পূর্ণ স্বয়ংসম্পূর্ণ। তাঁর জীবনের কোনো শুরু নেই, কোনো শেষ নেই। সমস্ত সৃষ্ট জীবনের উৎস তিনি নিজেই, এবং শেষ পর্যন্ত প্রতিটি জীবন তাঁর কাছেই প্রত্যাবর্তন করবে।

আরবি ح-ى-ى (হা-ইয়া-ইয়া) মূল ধাতু থেকে ‘হাইয়্যু’ শব্দটি এসেছে। এই মূল ধাতু চারটি গভীর অর্থ বহন করে—বেঁচে থাকা, স্পষ্ট বা প্রকাশিত হওয়া, পুনরুজ্জীবিত হওয়া ও পরিপূর্ণতা অর্জন করা। কুরআনে এই ধাতু থেকে উদ্ভূত শব্দ প্রায় ১৮৪ বার এসেছে, যা আল্লাহর জীবনদাতা সত্তা ও জীবনের গতিশীলতাকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।

ইসলামি আকিদা অনুযায়ী, আল-হাইয়্যুর জীবন মানুষের জীবনের মতো নয়। মানুষের জীবন সীমাবদ্ধ, অপূর্ণ এবং নির্ভরশীল; কিন্তু আল্লাহর জীবন পরিপূর্ণ ও নির্ভরহীন। তিনি নিজে জীবিত এবং অন্য সবাইকে জীবন দানকারী। তাঁর শ্রবণ, দৃষ্টি, জ্ঞান ও ক্ষমতা সবই নিখুঁত, কারণ এগুলো নিখুঁত জীবনেরই অংশ। কুরআনে বারবার আল-হাইয়্যু নামটির সঙ্গে আল-কাইয়্যুম নামটি যুক্ত হয়ে এসেছে, যা নির্দেশ করে—তিনি শুধু জীবিত নন, বরং সমগ্র সৃষ্টি তাঁর দ্বারাই স্থিতিশীল।

কুরআনের ভাষায়, “চিরঞ্জীব চিরস্থায়ীর সামনে সকল মুখ অবনত হবে” এবং “মরবেন না—এমন চিরঞ্জীব সত্তার উপর ভরসা করো।” এই আয়াতগুলো মানুষের জীবনে একটি মৌলিক শিক্ষা দেয়—ক্ষমতা, সম্পদ বা মানুষের উপর নয়, বরং চিরঞ্জীব আল্লাহর উপরই প্রকৃত ভরসা স্থাপন করা উচিত।

ইসলামি শিক্ষায় আল-হাইয়্যু নামটি কেবল জ্ঞানগত নয়, বরং ব্যবহারিক দিকনির্দেশনাও দেয়। বিশ্বাসীদের বলা হয়েছে—এই নামের উপলব্ধি যেন তাদের কাজকর্মে প্রতিফলিত হয়। মানুষ হয়তো সবকিছু দেখে না, কিন্তু আল-হাইয়্যু তাঁর নিখুঁত জীবন ও গুণাবলীর মাধ্যমে সবকিছুই দেখেন ও জানেন। এই বিশ্বাস মানুষকে অন্যায় থেকে বিরত রাখে এবং সৎকর্মে অনুপ্রাণিত করে।

রাসুলুল্লাহ (ﷺ) কঠিন মুহূর্তে আল-হাইয়্যু ও আল-কাইয়্যুমের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করতেন। তাঁর শেখানো দোয়াগুলো মুসলমানদের দৈনন্দিন জীবনে আল্লাহর উপর নির্ভরতার এক শক্তিশালী প্রকাশ। বিশেষ করে সকাল-সন্ধ্যার দোয়াগুলোতে আল-হাইয়্যুর কাছে নিজের সমস্ত বিষয় সোপর্দ করার শিক্ষা রয়েছে।

ইসলামি আলেমদের মতে, আল-হাইয়্যু নামের গভীর উপলব্ধি মানুষের মনে সান্ত্বনা ও স্থিরতা আনে। যখন মানুষ নিজেকে একা, পরাভূত বা নিঃস্ব মনে করে, তখন এই বিশ্বাস তাকে মনে করিয়ে দেয়—চিরঞ্জীব আল্লাহ সবসময় উপস্থিত, সবকিছু জানেন এবং শেষ বিচারের দিন ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত করবেন।

সবশেষে বলা যায়, আল-হাইয়্যু নামটি মানুষকে জীবন সম্পর্কে একটি মৌলিক সত্য শেখায়—সবকিছু ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু আল্লাহ চিরস্থায়ী। আর এই চিরঞ্জীব সত্তার দিকেই মানুষের চূড়ান্ত প্রত্যাবর্তন।