
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা একাধিক স্থানে নিজেকে ٱلْحَىُّ (আল-হাইয়্যু)—অর্থাৎ চিরঞ্জীব হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী, আল-হাইয়্যু এমন এক সত্তা যাঁর জীবন চিরন্তন, অমর এবং সম্পূর্ণ স্বয়ংসম্পূর্ণ। তাঁর জীবনের কোনো শুরু নেই, কোনো শেষ নেই। সমস্ত সৃষ্ট জীবনের উৎস তিনি নিজেই, এবং শেষ পর্যন্ত প্রতিটি জীবন তাঁর কাছেই প্রত্যাবর্তন করবে।
আরবি ح-ى-ى (হা-ইয়া-ইয়া) মূল ধাতু থেকে ‘হাইয়্যু’ শব্দটি এসেছে। এই মূল ধাতু চারটি গভীর অর্থ বহন করে—বেঁচে থাকা, স্পষ্ট বা প্রকাশিত হওয়া, পুনরুজ্জীবিত হওয়া ও পরিপূর্ণতা অর্জন করা। কুরআনে এই ধাতু থেকে উদ্ভূত শব্দ প্রায় ১৮৪ বার এসেছে, যা আল্লাহর জীবনদাতা সত্তা ও জীবনের গতিশীলতাকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
ইসলামি আকিদা অনুযায়ী, আল-হাইয়্যুর জীবন মানুষের জীবনের মতো নয়। মানুষের জীবন সীমাবদ্ধ, অপূর্ণ এবং নির্ভরশীল; কিন্তু আল্লাহর জীবন পরিপূর্ণ ও নির্ভরহীন। তিনি নিজে জীবিত এবং অন্য সবাইকে জীবন দানকারী। তাঁর শ্রবণ, দৃষ্টি, জ্ঞান ও ক্ষমতা সবই নিখুঁত, কারণ এগুলো নিখুঁত জীবনেরই অংশ। কুরআনে বারবার আল-হাইয়্যু নামটির সঙ্গে আল-কাইয়্যুম নামটি যুক্ত হয়ে এসেছে, যা নির্দেশ করে—তিনি শুধু জীবিত নন, বরং সমগ্র সৃষ্টি তাঁর দ্বারাই স্থিতিশীল।
কুরআনের ভাষায়, “চিরঞ্জীব চিরস্থায়ীর সামনে সকল মুখ অবনত হবে” এবং “মরবেন না—এমন চিরঞ্জীব সত্তার উপর ভরসা করো।” এই আয়াতগুলো মানুষের জীবনে একটি মৌলিক শিক্ষা দেয়—ক্ষমতা, সম্পদ বা মানুষের উপর নয়, বরং চিরঞ্জীব আল্লাহর উপরই প্রকৃত ভরসা স্থাপন করা উচিত।
ইসলামি শিক্ষায় আল-হাইয়্যু নামটি কেবল জ্ঞানগত নয়, বরং ব্যবহারিক দিকনির্দেশনাও দেয়। বিশ্বাসীদের বলা হয়েছে—এই নামের উপলব্ধি যেন তাদের কাজকর্মে প্রতিফলিত হয়। মানুষ হয়তো সবকিছু দেখে না, কিন্তু আল-হাইয়্যু তাঁর নিখুঁত জীবন ও গুণাবলীর মাধ্যমে সবকিছুই দেখেন ও জানেন। এই বিশ্বাস মানুষকে অন্যায় থেকে বিরত রাখে এবং সৎকর্মে অনুপ্রাণিত করে।
রাসুলুল্লাহ (ﷺ) কঠিন মুহূর্তে আল-হাইয়্যু ও আল-কাইয়্যুমের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করতেন। তাঁর শেখানো দোয়াগুলো মুসলমানদের দৈনন্দিন জীবনে আল্লাহর উপর নির্ভরতার এক শক্তিশালী প্রকাশ। বিশেষ করে সকাল-সন্ধ্যার দোয়াগুলোতে আল-হাইয়্যুর কাছে নিজের সমস্ত বিষয় সোপর্দ করার শিক্ষা রয়েছে।
ইসলামি আলেমদের মতে, আল-হাইয়্যু নামের গভীর উপলব্ধি মানুষের মনে সান্ত্বনা ও স্থিরতা আনে। যখন মানুষ নিজেকে একা, পরাভূত বা নিঃস্ব মনে করে, তখন এই বিশ্বাস তাকে মনে করিয়ে দেয়—চিরঞ্জীব আল্লাহ সবসময় উপস্থিত, সবকিছু জানেন এবং শেষ বিচারের দিন ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত করবেন।
সবশেষে বলা যায়, আল-হাইয়্যু নামটি মানুষকে জীবন সম্পর্কে একটি মৌলিক সত্য শেখায়—সবকিছু ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু আল্লাহ চিরস্থায়ী। আর এই চিরঞ্জীব সত্তার দিকেই মানুষের চূড়ান্ত প্রত্যাবর্তন।
সমাচার বিশ্ব নিউজ ডেক্স 


















