
আল্লাহ তাআলা হলেন আল-ক্বাইয়ুম—সমস্ত কিছুর ধারক, সংরক্ষণকারী ও রক্ষণাবেক্ষণকারী। তিনি নিজে থেকেই প্রতিষ্ঠিত, তাঁর অস্তিত্ব কোনো কিছুর উপর নির্ভরশীল নয়। বরং আসমান-জমিনে যা কিছু আছে, দৃশ্যমান ও অদৃশ্য—সব কিছুর অস্তিত্ব সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে তাঁর উপর। আল্লাহ তাআলার এই গুণই তাঁকে সৃষ্টিজগতের একমাত্র নির্ভরযোগ্য ধারক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
পবিত্র কুরআনের আয়াতুল কুরসিতে আল্লাহ তাআলা বলেন, “তিনি চিরঞ্জীব, সমস্ত কিছুর ধারক” (সূরা আল-বাক্বারাহ: ২৫৫)। এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তাঁর চিরস্থায়ী অস্তিত্ব ও সমগ্র সৃষ্টির উপর তাঁর নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন। তিনি অনন্ত বিদ্যমান, আর তাঁর ধারকত্বের ফলেই মহাবিশ্ব আজও টিকে আছে।
ক্বাইয়্যুম শব্দটি এসেছে আরবি ক্বিয়াম শব্দ থেকে। কুরআনে এই নামটি তিনবার উল্লেখ করা হয়েছে। ক্বাইয়্যুম সেই সত্তা, যিনি নিজে জীবিত এবং একই সঙ্গে অন্য সব সত্তাকে জীবিত রাখেন, পরিচালনা করেন ও নিয়ন্ত্রণ করেন। আল্লাহর এই গুণ এমন এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য, যাতে কোনো সৃষ্টিই অংশীদার হতে পারে না। তাঁর সত্তার স্থায়িত্বের জন্য কারো সাহায্য বা অবলম্বনের প্রয়োজন নেই।
মহাবিশ্বের বিশালতা ও জটিলতা মানুষের কল্পনাকেও ছাড়িয়ে যায়। অসংখ্য নক্ষত্র, গ্রহ, গ্যালাক্সি এবং পৃথিবীর সূক্ষ্মতম জীবনব্যবস্থা—সবকিছুই এক নিখুঁত ভারসাম্যে চলছে। যিনি এই মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছেন, তিনিই আল-ক্বাইয়ুম। তিনি যদি এক মুহূর্তের জন্যও তাঁর ধারকত্ব তুলে নিতেন, তাহলে সৃষ্টিজগৎ মুহূর্তেই ধ্বংস হয়ে যেত।
আল্লাহর আল-ক্বাইয়ুম নামটি মানুষকে গভীর আত্মসচেতনতার দিকে আহ্বান জানায়। প্রতিটি মুহূর্তে আল্লাহ তাআলা আমাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছেন। আমাদের হৃদপিণ্ডের স্পন্দন, শ্বাস-প্রশ্বাস, জীবনধারণের সব প্রক্রিয়াই তাঁর নিয়ন্ত্রণে। তিনি চাইলে যে কোনো মুহূর্তে এসব থামিয়ে দিতে পারেন। এই উপলব্ধি মানুষকে অন্যায়, গোনাহ ও ভুল সিদ্ধান্ত থেকে দূরে থাকতে সহায়তা করে এবং আল্লাহভীতির গুণ, অর্থাৎ তাকওয়া অর্জনকে সহজ করে তোলে।
আল্লাহ তাআলা কোটি কোটি বছর ধরে অসংখ্য প্রাকৃতিক ঘটনা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করে আসছেন। সূর্য, বৃষ্টি, ফসল, খাদ্য ও জীবনধারণের উপকরণ—সবকিছুই তাঁর নিরবচ্ছিন্ন ব্যবস্থাপনার ফল। আল্লাহ যদি আল-ক্বাইয়ুম না হতেন, তাহলে এই সৃষ্টিজগতের কিছুই টিকে থাকত না। এই বাস্তবতা উপলব্ধি করলে মানুষের অন্তরে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা ও আনুগত্যের অনুভূতি আরও গভীর হয়।
আল্লাহ তাআলা নিজেই কুরআনে বলেছেন, “আল্লাহর অনেক সুন্দর সুন্দর নাম আছে, সেই নামগুলোর মাধ্যমে তোমরা তাঁকে ডাকো” (সূরা আরাফ: ১৮০)। হাদিসে বর্ণিত আছে, বিপদ ও সংকটকালে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) দোয়া করতেন—
“ইয়া হাইয়্যু, ইয়া কাইয়্যুম, বিরাহমাতিকা আসতাগিছু”—
অর্থাৎ, হে চিরঞ্জীব, হে চিরস্থায়ী ধারক, তোমার রহমতের মাধ্যমে আমি সাহায্য প্রার্থনা করি।
ইসলামি শিক্ষায় আল-ক্বাইয়ুম নামের জিকির ও আমলের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। এই নামের মাধ্যমে দোয়া করলে বান্দা আল্লাহর পূর্ণ ক্ষমতা ও নিজের সম্পূর্ণ অসহায়ত্ব উপলব্ধি করতে পারে। আল-ক্বাইয়ুমের এই ধারণা মুমিনকে তাকওয়াবান, কৃতজ্ঞ ও দায়িত্বশীল জীবনযাপনে অনুপ্রাণিত করে।
সবশেষে, আল-ক্বাইয়ুম নামটি মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয়—আমরা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু আল্লাহ চিরস্থায়ী। আমাদের অস্তিত্ব তাঁর ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল। এই উপলব্ধিই একজন মুমিনের বিশ্বাস, আমল ও নৈতিকতার ভিত্তিকে দৃঢ় করে তোলে।
আল্লাহ তাআলা যেন মুসলিম উম্মাহকে আল-ক্বাইয়ুম নামের ফজিলত ও আমল দৈনন্দিন জীবনে বাস্তবায়নের তাওফিক দান করেন। আমিন।
সমাচার বিশ্ব নিউজ ডেক্স 



















