
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ব্যাপক কর্মসংস্থান, সুশাসন ও রাষ্ট্র সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে আনুষ্ঠানিকভাবে ইশতেহার ঘোষণা করেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ইশতেহারের স্লোগান হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে— ‘সবার আগে বাংলাদেশ’।
ইশতেহারে দুর্নীতি নির্মূল, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। বিএনপি ক্ষমতায় গেলে প্রথম ১৮ মাসে সরকারি–বেসরকারি ও পাবলিক–প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) মডেলে এক কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির ঘোষণা দিয়েছে। পাশাপাশি তরুণ, কৃষক, শ্রমিক ও নারীদের জন্য বিশেষ লক্ষ্যভিত্তিক কর্মসূচির কথা তুলে ধরা হয়েছে।
আট মূল অঙ্গীকার ও সামাজিক নিরাপত্তা
বিএনপির ইশতেহারে মোট আটটি মূল প্রতিশ্রুতি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে— ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড চালু, সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার, কৃষকদের জন্য সুদসহ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ এবং কৃষিপণ্যের স্বচ্ছ ক্রয়ব্যবস্থা। নদী ও জলসম্পদ ব্যবস্থাপনায় ২০ হাজার কিলোমিটার নদী–খাল খনন ওপুনঃখনন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং ফারাক্কার বিপরীতে পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের অঙ্গীকারও রয়েছে।
জুলাই সনদ ও রাষ্ট্র সংস্কার
ইশতেহার ঘোষণায় তারেক রহমান বলেন, “বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে জুলাই জাতীয় সনদ অবশ্যই বাস্তবায়ন করবে।” তিনি জানান, ইশতেহারটি বিএনপির ঘোষিত ৩১ দফা, জুলাই সনদ এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক দিকনির্দেশনার সমন্বয়ে প্রণীত।
রাষ্ট্র কাঠামো সংস্কারের অংশ হিসেবে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠন, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছরে সীমাবদ্ধকরণ, বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা এবং সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংস্কারের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
গণমাধ্যম ও মানবাধিকার
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পুনঃনিরীক্ষণ, সাংবাদিক নির্যাতন রোধে বিশেষ সেল গঠন এবং জাতীয় সাংবাদিক অবসর কল্যাণ বোর্ড প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার রয়েছে।
শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নারীর ক্ষমতায়ন
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিএনপি। প্রতিটি নাগরিকের জন্য ই–হেলথ কার্ড চালু করে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। নারীদের জন্য কর্মক্ষেত্রে সমান সুযোগ, নারী উদ্যোক্তা তহবিল, মাতৃত্বকালীন ভাতা বৃদ্ধি এবং সহিংসতা প্রতিরোধে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠনের অঙ্গীকার করা হয়েছে।
তরুণ ও কর্মসংস্থান
তরুণদের জন্য স্টার্টআপ ফান্ড, আইটি প্রশিক্ষণ, আইটি পার্কে বিশেষ সুবিধা, বিদেশে নতুন শ্রমবাজার সৃষ্টি এবং ৫ বছরে এক কোটি জনশক্তি রপ্তানির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তথ্য ও প্রযুক্তি খাতে ১০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান তৈরির কথাও রয়েছে।
পরিবেশ ও জ্বালানি
পরিবেশ সুরক্ষায় আগামী ৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ, প্লাস্টিক বর্জ্য ৩০ শতাংশ কমানো এবং ২০৩০ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৩৫ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
ইশতেহার ঘোষণার অনুষ্ঠানে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত ও জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু হয়। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। স্বাগত বক্তব্য দেন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। অনুষ্ঠানে কূটনীতিক, বিভিন্ন শ্রেণি–পেশার বিশিষ্টজন এবং দলীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
বিএনপি নেতাদের প্রত্যাশা, ৩১ দফা, জুলাই সনদ এবং লক্ষ্যভিত্তিক প্রতিশ্রুতির সমন্বয়ে প্রণীত এই ইশতেহার জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণে কার্যকর ভূমিকা রাখবে এবং ভেঙে পড়া রাষ্ট্রকাঠামো পুনর্গঠনে পথ দেখাবে।
সমাচার বিশ্ব নিউজ ডেক্স 



















