
আজ পয়লা ফাল্গুন। ঋতুরাজ বসন্তের প্রথম দিন। বাংলা সনের একাদশ মাসের সূচনা ঘিরে সারা দেশে বইছে উৎসবের আমেজ। একই দিনে বিশ্ব ভালোবাসা দিবস হওয়ায় উৎসবে যুক্ত হয়েছে বাড়তি মাত্রা। প্রকৃতির রঙিন সাজ, তরুণ-তরুণীদের বাসন্তী পোশাক আর দখিনা হাওয়ার মৃদু পরশে প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা।
১৯৯১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে পয়লা ফাল্গুন উদযাপনের আয়োজন করে। এরপর থেকেই দিনটি বাঙালির সাংস্কৃতিক ক্যালেন্ডারে বিশেষ গুরুত্ব পেয়ে আসছে। এ বছরও বসন্ত উৎসব উদ্যাপন পরিষদের আয়োজনে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রাঙ্গণে সীমিত পরিসরে বসন্তবরণ অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
রাজধানীর ‘ফুসফুস’খ্যাত রমনা পার্ক-এ দেখা গেছে শিমুল, পলাশ, রক্তকাঞ্চনের রঙিন সমারোহ। কোকিলের কুহুতান আর আম্রকুঞ্জের মুকুলের ঘ্রাণে চারদিক ভরে উঠেছে। অনেক তরুণীর পরনে হলুদ, বাসন্তী ও কমলা রঙের শাড়ি; মাথায় গাঁদা ফুলের মালা। অন্যদিকে ছেলেদের পরনে রঙিন পাঞ্জাবি ও ফতুয়া। এ রঙিন সাজে ঢাকার যান্ত্রিক চেহারা যেন মুহূর্তেই বদলে গেছে।
ফাল্গুনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাঙালির ঐতিহ্য ও ইতিহাস। ‘ফাল্গুন’ নামটি এসেছে ফাল্গুনী নক্ষত্র থেকে। ১৯৫০–৬০ দশকে পাকিস্তানি সাংস্কৃতিক প্রভাব থেকে নিজেদের আলাদা পরিচয় প্রতিষ্ঠার প্রয়াসে রবীন্দ্রসংগীত ও বাঙালি আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পয়লা ফাল্গুন উদযাপন জনপ্রিয়তা পায়। বসন্তের রক্তিম রং স্মরণ করিয়ে দেয় বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের শহীদদের আত্মত্যাগের কথা—রফিক, সালাম, বরকত, জব্বারদের রক্তে রাঙা ইতিহাসও ফাল্গুনের স্মারক হয়ে আছে।
বসন্ত নিয়ে সাহিত্য-সংগীতে রয়েছে বিস্তৃত আয়োজন। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন—‘আজি খুলিয়ো হৃদয়দল খুলিয়ো…’। বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিম-এর কণ্ঠে ‘বসন্ত বাতাসে সই গো’ গানটিও এ সময় নতুন করে প্রাণ পায়।
অন্যদিকে ১৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে ভ্যালেনটাইনস ডে বা ভালোবাসা দিবস। ইতিহাসবিদদের মতে, খ্রিষ্টীয় তৃতীয় শতকে রোমান পাদ্রি সেন্ট ভ্যালেনটাইনের স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে এ দিনের সূচনা। সেই ধারাবাহিকতায় এখন বিশ্বব্যাপী প্রিয়জনদের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের দিন হিসেবে দিনটি উদযাপিত হয়।
বসন্ত প্রকৃতিতে নবজাগরণের বার্তা আনে। শীতের রুক্ষতা পেরিয়ে গাছে গাছে নতুন পাতা, ফুলের মুকুল আর প্রজাপতির রঙিন ডানা জানিয়ে দেয় পরিবর্তনের কথা। গ্রামবাংলায় আম্রকাননের মুকুল, শিমুল-পলাশের আগুনরাঙা রং আর পুকুরপাড়ের ঝরা শজনে ফুলে প্রকৃতি হয়ে ওঠে সতেজ।
তবে জলবায়ু পরিবর্তন ও নগরায়ণের প্রভাবে ঋতুচক্রের স্বাভাবিক রূপ নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে। বন উজাড় আর দালানকোঠার ভিড়ে ক্রমেই কমে আসছে বসন্তের চিরচেনা রূপ। তবু প্রতিবছরই ফাল্গুন ফিরে আসে নবপ্রাণের বার্তা নিয়ে—শীতের রিক্ততার পর নবজাগরণ অনিবার্য, এ আশাই জাগিয়ে তোলে বসন্ত।
পয়লা ফাল্গুন ও ভালোবাসা দিবসের এ জোড়া উৎসব বাঙালির সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও আবেগের অনন্য মেলবন্ধন হয়ে উঠেছে। রঙে, গানে আর ভালোবাসার উচ্ছ্বাসে আজ মুখরিত পুরো দেশ।
সমাচার বিশ্ব নিউজ ডেক্স 



















