
২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২২। ক্রিমিয়া দখলের আট বছর পর রাশিয়া পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু করে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে। চার বছর পেরিয়ে যুদ্ধ এখন পঞ্চম বছরে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপীয় ভূখণ্ডে এটিই সবচেয়ে প্রাণঘাতী সংঘাত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবু বাস্তবতা হলো, মস্কো এখনো পরাজিত হয়নি, কিয়েভও ভেঙে পড়েনি।
শুরুর দিকে ধারণা ছিল দ্রুত অভিযানেই ইউক্রেনের রাজধানী দখল হবে। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির নেতৃত্বে ইউক্রেনীয় প্রতিরোধ অপ্রত্যাশিতভাবে শক্ত অবস্থান নেয়। রুশ বাহিনীর দ্রুত অগ্রযাত্রা থেমে যায়। বুচা ও ইজিয়ুমে বেসামরিক হত্যাকাণ্ড, মারিউপোলের ধ্বংসযজ্ঞ, আজভস্টাল কারখানায় লড়াই এবং ২০২৩ সালে ব্যর্থ ওয়াগনার বিদ্রোহ—সব মিলিয়ে যুদ্ধ নতুন নতুন মাত্রা পেয়েছে। এমনকি ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে হোয়াইট হাউসে জেলেনস্কি ও ডোনাল্ড ট্রাম্পর মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ও আন্তর্জাতিক আলোচনায় নতুন অনিশ্চয়তা যোগ করেছে।
স্থলভাগে এখন এক ধরনের স্থবির ভারসাম্য তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার (আইএসডব্লিউ)-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, রাশিয়া বর্তমানে ইউক্রেনের প্রায় ১৯ থেকে ২০ শতাংশ ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করছে, যার মধ্যে রয়েছে ক্রিমিয়া, লুহানস্কের প্রায় পুরো অংশ, দোনেৎস্কের বড় অংশ এবং জাপোরিঝিয়া ও খেরসনের বিস্তীর্ণ এলাকা। ২০২৫ সালের শুরু থেকে রুশ অগ্রগতি অত্যন্ত ধীর, অনেক ক্ষেত্রে প্রতিদিন কয়েক মিটার হিসেবে পরিমাপ করা হচ্ছে। ২০২৪ সালের পর থেকে অতিরিক্ত দখল ১.৫ শতাংশের বেশি নয়।
যুদ্ধ এখন অনেকটাই ক্ষয়ক্ষতির লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। ড্রোন হামলা, আর্টিলারি গোলাবর্ষণ এবং পরিখাভিত্তিক যুদ্ধ পরিস্থিতিকে দীর্ঘস্থায়ী করেছে। ফরাসি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষণ বলছে, জনবল ও ক্ষয়ক্ষতি সহ্য করার সক্ষমতায় রাশিয়ার কিছু সুবিধা রয়েছে। একই সঙ্গে চীনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা এবং ইরান ও উত্তর কোরিয়ার সামরিক সরবরাহ মস্কোর পক্ষে কাজ করছে।
মানবিক ক্ষয়ক্ষতির হিসাব ভয়াবহ। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, চার বছরে অন্তত ১৫ হাজার ইউক্রেনীয় বেসামরিক নিহত এবং ৪০ হাজারের বেশি আহত হয়েছেন, যদিও প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। সামরিক ক্ষয়ক্ষতির ক্ষেত্রে পশ্চিমা বিশ্লেষণ বলছে, ইউক্রেনের নিহত সেনা ১ লাখের বেশি হতে পারে। অন্যদিকে সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস) ও ব্রিটিশ গোয়েন্দা মূল্যায়নে রাশিয়ার মোট হতাহতের সংখ্যা ১০ লাখ ছাড়িয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যার মধ্যে কয়েক লাখ নিহত। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০২৬ সালের মধ্যে উভয় পক্ষের সম্মিলিত হতাহত ২০ লাখে পৌঁছাতে পারে।
অর্থনৈতিক ক্ষতিও ব্যাপক। ইউক্রেনের বহু শহর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে, বিদ্যুৎ অবকাঠামো বারবার হামলার শিকার হয়েছে। দেশটির প্রায় ২০ শতাংশ ভূমি মাইন দ্বারা দূষিত। পুনর্গঠনে ৫০০ বিলিয়ন ইউরোর বেশি ব্যয় হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ২০২২ সালে ইউক্রেন তার জিডিপির এক-তৃতীয়াংশ হারায় এবং এখনও প্রতিরক্ষা ও মৌলিক ব্যয়ের জন্য পশ্চিমা সহায়তার ওপর নির্ভরশীল।
চার বছর পর চিত্রটি স্পষ্ট। যুদ্ধ শেষ হয়নি, সিদ্ধান্তও হয়নি। রাশিয়া তার কৌশলগত লক্ষ্য পুরোপুরি অর্জন করতে পারেনি, ইউক্রেনও হার মানেনি। স্থলভাগে ধীর অগ্রগতি, আকাশে ড্রোন যুদ্ধ, কূটনৈতিক অচলাবস্থা এবং ক্রমবর্ধমান মানবিক মূল্য—সব মিলিয়ে সংঘাতটি ইউরোপের নিরাপত্তা কাঠামোকে দীর্ঘমেয়াদে বদলে দিয়েছে। সামনে কী হবে, তা নির্ভর করছে যুদ্ধক্ষেত্রের গতিপথের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সমর্থন ও কূটনৈতিক উদ্যোগের ওপর।
সমাচার বিশ্ব নিউজ ডেক্স 



















