
দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংক–এর গভর্নর পদে একজন সক্রিয় ব্যবসায়ীর নিয়োগ দেশের অর্থনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সরকার চার বছরের জন্য মো. মোস্তাকুর রহমানকে গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। তিনি পোশাক ও রিয়েল এস্টেট খাতের ব্যবসায়ী, হেরা সোয়েটার্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং বিজিএমইএর বাংলাদেশ ব্যাংক–বিষয়ক স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো আপাদমস্তক ব্যবসায়ী কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হলেন। ফলে একদিকে যেমন ‘ব্যবসায়িক বাস্তবতা বোঝেন’—এমন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে তেমনি ‘স্বার্থের সংঘাত’ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে নীতি নির্ধারণী মহলে।
বিশ্বে ব্যবসায়ী থেকে গভর্নর হওয়ার ঘটনা বিরল। তবে আন্তর্জাতিক আলোচনায় সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ ছিলেন মার্ক কার্নি। তিনি ২০০৮-২০১৩ পর্যন্ত ব্যাংক অব কানাডা–এর গভর্নর এবং পরে ২০১৩-২০২০ পর্যন্ত ব্যাংক অব ইংল্যান্ড–এর গভর্নর ছিলেন। বিশ্বমন্দা-পরবর্তী সময়ে কানাডার অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখায় তার ভূমিকা প্রশংসিত হয়।
তবে কার্নি ছিলেন আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন পেশাদার। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে নতুন গভর্নরের পটভূমি সরাসরি করপোরেট ও রপ্তানি ব্যবসাকেন্দ্রিক—যা বিতর্কের মূল কেন্দ্রবিন্দু।
বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার, ১৯৭২ অনুযায়ী, গভর্নর নিয়োগের ক্ষমতা সরকারের হাতে এবং মেয়াদ চার বছর। নির্দিষ্ট যোগ্যতার মানদণ্ড আইনে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই। ২০২৪ সালে বয়সসীমাও তুলে নেওয়া হয়।
আইনের এই নমনীয়তা সরকারের পছন্দকে মুখ্য করে তোলে। তবে উন্নত দেশগুলোতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রধান নিয়োগে আর্থিক বাজার, মুদ্রানীতি ও আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থায় অভিজ্ঞতা প্রায় অলিখিত বাধ্যবাধকতা।
স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নররা মূলত আমলা, অর্থনীতিবিদ বা পেশাদার ব্যাংকার ছিলেন। সর্বশেষ গভর্নর আহসান এইচ মনসুর ছিলেন আইএমএফের সাবেক কর্মকর্তা। তার আগে ফজলে কবির, আতিউর রহমানসহ অধিকাংশ গভর্নর অর্থনীতি ও নীতি-প্রশাসনের পটভূমি থেকে এসেছেন।
এই ধারাবাহিকতার বাইরে গিয়ে এবার একজন ব্যবসায়ীকে দায়িত্ব দেওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে—নীতিনির্ধারণে কি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি আসবে, নাকি বাড়বে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর প্রভাব?
নিয়োগের আগে মোস্তাকুর রহমানের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ‘হেরা সোয়েটার্স লিমিটেড’-এর ৮৯ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিল হয়েছে বলে জানা গেছে। ব্যাংকিং খাতের কয়েকজন ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রশ্ন তুলেছেন—যিনি নিজ প্রতিষ্ঠানের জন্য বিশেষ সুবিধা পেয়েছেন, তিনি কি নিরপেক্ষভাবে খেলাপি ঋণসংক্রান্ত কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন?
সরকারি প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, তিনি অন্য সব প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের সঙ্গে কর্ম–সম্পর্ক ত্যাগের শর্তে নিয়োগ পেয়েছেন। তবে বাস্তবে ব্যবসায়িক প্রভাবমুক্ত থাকা কতটা সম্ভব হবে—সেটি সময়ই বলবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল কাজ শুধু সুদের হার নির্ধারণ নয়; বরং—
- মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ
- মুদ্রা সরবরাহ ব্যবস্থাপনা
- ব্যাংক তদারকি ও আর্থিক স্থিতিশীলতা
- বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা
- সরকারের অর্থনৈতিক পরামর্শদাতা হিসেবে কাজ
বিশ্ব অর্থনীতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতার গুরুত্ব নতুন করে প্রতিষ্ঠা করেন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের সাবেক চেয়ারম্যান পল ভলকার। রাজনৈতিক চাপের মুখেও কঠোর মুদ্রানীতির মাধ্যমে তিনি উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকে বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা এখন একটি স্বীকৃত নীতি।
জাতীয় নাগরিক পার্টির সাবেক যুগ্ম সদস্যসচিব ডা. তাসনিম জারা পাঁচটি প্রশ্ন তুলেছেন, যা মূলত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা ও জবাবদিহিকে ঘিরে:
- গভর্নর কি সরকারের সঙ্গে ভিন্নমত প্রকাশ করতে পারবেন?
- ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততা পুরোপুরি ত্যাগ করা হয়েছে কি?
- খেলাপি ঋণ সংকট মোকাবিলায় কী উদ্যোগ নেওয়া হবে?
- সুদের হার ও মুদ্রানীতিতে ধারাবাহিকতা থাকবে, নাকি পরিবর্তন আসবে?
- টাকার বিনিময় হার বাজারভিত্তিক থাকবে, নাকি নিয়ন্ত্রিত হবে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর নির্ভর করবে ভবিষ্যৎ নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপর।
বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে আস্থাহীনতা, খেলাপি ঋণের উচ্চ হার, মুদ্রাস্ফীতির চাপ এবং ডলারের অস্থিরতা বড় চ্যালেঞ্জ। নতুন গভর্নর ইতিমধ্যে ‘ট্রাস্ট বিল্ডিং’ ও সুদের হার কমানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আস্থা ফেরাতে হলে দরকার স্বচ্ছতা, কঠোর নজরদারি এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত সিদ্ধান্ত।
একজন ব্যবসায়ীকে গভর্নর নিয়োগ নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত। এটি যেমন বাস্তবমুখী অভিজ্ঞতা নিয়ে আসতে পারে, তেমনি নীতিনির্ধারণে স্বার্থের সংঘাতের ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে এখন দ্বৈত পরীক্ষা—একদিকে আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, অন্যদিকে প্রমাণ করা যে প্রতিষ্ঠানটি রাজনৈতিক ও গোষ্ঠীগত প্রভাবের ঊর্ধ্বে থেকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে সক্ষম।
আগামী মাসগুলোর নীতিগত সিদ্ধান্তই বলে দেবে—এটি কি নতুন যুগের সূচনা, নাকি বিতর্কিত এক অধ্যায়ের শুরু।
সমাচার বিশ্ব নিউজ ডেক্স 



















