০২:৪১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৬ মার্চ ২০২৬, ২২ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ব্যবসায়ী থেকে গভর্নর: বাংলাদেশ ব্যাংকে নতুন অধ্যায়, নাকি স্বার্থের সংঘাতের শঙ্কা?

ব্যবসায়ী থেকে গভর্নর: বাংলাদেশ ব্যাংকে নতুন অধ্যায়, নাকি স্বার্থের সংঘাতের শঙ্কা?

দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংক–এর গভর্নর পদে একজন সক্রিয় ব্যবসায়ীর নিয়োগ দেশের অর্থনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সরকার চার বছরের জন্য মো. মোস্তাকুর রহমানকে গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। তিনি পোশাক ও রিয়েল এস্টেট খাতের ব্যবসায়ী, হেরা সোয়েটার্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং বিজিএমইএর বাংলাদেশ ব্যাংক–বিষয়ক স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো আপাদমস্তক ব্যবসায়ী কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হলেন। ফলে একদিকে যেমন ‘ব্যবসায়িক বাস্তবতা বোঝেন’—এমন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে তেমনি ‘স্বার্থের সংঘাত’ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে নীতি নির্ধারণী মহলে।

বিশ্বে ব্যবসায়ী থেকে গভর্নর হওয়ার ঘটনা বিরল। তবে আন্তর্জাতিক আলোচনায় সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ ছিলেন মার্ক কার্নি। তিনি ২০০৮-২০১৩ পর্যন্ত ব্যাংক অব কানাডা–এর গভর্নর এবং পরে ২০১৩-২০২০ পর্যন্ত ব্যাংক অব ইংল্যান্ড–এর গভর্নর ছিলেন। বিশ্বমন্দা-পরবর্তী সময়ে কানাডার অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখায় তার ভূমিকা প্রশংসিত হয়।

তবে কার্নি ছিলেন আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন পেশাদার। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে নতুন গভর্নরের পটভূমি সরাসরি করপোরেট ও রপ্তানি ব্যবসাকেন্দ্রিক—যা বিতর্কের মূল কেন্দ্রবিন্দু।

বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার, ১৯৭২ অনুযায়ী, গভর্নর নিয়োগের ক্ষমতা সরকারের হাতে এবং মেয়াদ চার বছর। নির্দিষ্ট যোগ্যতার মানদণ্ড আইনে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই। ২০২৪ সালে বয়সসীমাও তুলে নেওয়া হয়।

আইনের এই নমনীয়তা সরকারের পছন্দকে মুখ্য করে তোলে। তবে উন্নত দেশগুলোতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রধান নিয়োগে আর্থিক বাজার, মুদ্রানীতি ও আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থায় অভিজ্ঞতা প্রায় অলিখিত বাধ্যবাধকতা।

স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নররা মূলত আমলা, অর্থনীতিবিদ বা পেশাদার ব্যাংকার ছিলেন। সর্বশেষ গভর্নর আহসান এইচ মনসুর ছিলেন আইএমএফের সাবেক কর্মকর্তা। তার আগে ফজলে কবির, আতিউর রহমানসহ অধিকাংশ গভর্নর অর্থনীতি ও নীতি-প্রশাসনের পটভূমি থেকে এসেছেন।

এই ধারাবাহিকতার বাইরে গিয়ে এবার একজন ব্যবসায়ীকে দায়িত্ব দেওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে—নীতিনির্ধারণে কি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি আসবে, নাকি বাড়বে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর প্রভাব?

নিয়োগের আগে মোস্তাকুর রহমানের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ‘হেরা সোয়েটার্স লিমিটেড’-এর ৮৯ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিল হয়েছে বলে জানা গেছে। ব্যাংকিং খাতের কয়েকজন ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রশ্ন তুলেছেন—যিনি নিজ প্রতিষ্ঠানের জন্য বিশেষ সুবিধা পেয়েছেন, তিনি কি নিরপেক্ষভাবে খেলাপি ঋণসংক্রান্ত কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন?

সরকারি প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, তিনি অন্য সব প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের সঙ্গে কর্ম–সম্পর্ক ত্যাগের শর্তে নিয়োগ পেয়েছেন। তবে বাস্তবে ব্যবসায়িক প্রভাবমুক্ত থাকা কতটা সম্ভব হবে—সেটি সময়ই বলবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল কাজ শুধু সুদের হার নির্ধারণ নয়; বরং—

  • মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ
  • মুদ্রা সরবরাহ ব্যবস্থাপনা
  • ব্যাংক তদারকি ও আর্থিক স্থিতিশীলতা
  • বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা
  • সরকারের অর্থনৈতিক পরামর্শদাতা হিসেবে কাজ

বিশ্ব অর্থনীতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতার গুরুত্ব নতুন করে প্রতিষ্ঠা করেন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের সাবেক চেয়ারম্যান পল ভলকার। রাজনৈতিক চাপের মুখেও কঠোর মুদ্রানীতির মাধ্যমে তিনি উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকে বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা এখন একটি স্বীকৃত নীতি।

জাতীয় নাগরিক পার্টির সাবেক যুগ্ম সদস্যসচিব ডা. তাসনিম জারা পাঁচটি প্রশ্ন তুলেছেন, যা মূলত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা ও জবাবদিহিকে ঘিরে:

  1. গভর্নর কি সরকারের সঙ্গে ভিন্নমত প্রকাশ করতে পারবেন?
  2. ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততা পুরোপুরি ত্যাগ করা হয়েছে কি?
  3. খেলাপি ঋণ সংকট মোকাবিলায় কী উদ্যোগ নেওয়া হবে?
  4. সুদের হার ও মুদ্রানীতিতে ধারাবাহিকতা থাকবে, নাকি পরিবর্তন আসবে?
  5. টাকার বিনিময় হার বাজারভিত্তিক থাকবে, নাকি নিয়ন্ত্রিত হবে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর নির্ভর করবে ভবিষ্যৎ নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপর।

বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে আস্থাহীনতা, খেলাপি ঋণের উচ্চ হার, মুদ্রাস্ফীতির চাপ এবং ডলারের অস্থিরতা বড় চ্যালেঞ্জ। নতুন গভর্নর ইতিমধ্যে ‘ট্রাস্ট বিল্ডিং’ ও সুদের হার কমানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আস্থা ফেরাতে হলে দরকার স্বচ্ছতা, কঠোর নজরদারি এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত সিদ্ধান্ত।

একজন ব্যবসায়ীকে গভর্নর নিয়োগ নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত। এটি যেমন বাস্তবমুখী অভিজ্ঞতা নিয়ে আসতে পারে, তেমনি নীতিনির্ধারণে স্বার্থের সংঘাতের ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে এখন দ্বৈত পরীক্ষা—একদিকে আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, অন্যদিকে প্রমাণ করা যে প্রতিষ্ঠানটি রাজনৈতিক ও গোষ্ঠীগত প্রভাবের ঊর্ধ্বে থেকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে সক্ষম।

আগামী মাসগুলোর নীতিগত সিদ্ধান্তই বলে দেবে—এটি কি নতুন যুগের সূচনা, নাকি বিতর্কিত এক অধ্যায়ের শুরু।

ট্যাগ

সৌদি আরব ও কুয়েত লক্ষ্য করে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ

সৌদি আরব ও কুয়েত লক্ষ্য করে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার নতুন অধ্যায় তৈরি হয়েছে। সৌদি আরব ও কুয়েতকে লক্ষ্য করে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে ইরান বলে অভিযোগ উঠেছে। শুক্রবার মধ্যরাতের পর এসব মিসাইল ছোড়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে সৌদি আরব ও কুয়েত উভয় দেশই জানিয়েছে, তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হামলাগুলো সফলভাবে প্রতিহত করেছে। সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী রিয়াদের কাছে অবস্থিত প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিকে লক্ষ্য করে তিনটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়। কিন্তু লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছানোর আগেই সৌদি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মিসাইলগুলো ধ্বংস করে দেয়। এতে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে কুয়েতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, একটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র তাদের আকাশসীমায় প্রবেশ করেছিল। দ্রুত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করে সেটিকে ধ্বংস করা হয়। তবে প্রতিরক্ষা মিসাইলের ধ্বংসাবশেষ একটি এলাকায় পড়ে সামান্য ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে বলে জানানো হয়েছে। যদিও এতে বড় ধরনের কোনো ক্ষতি বা প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি। এদিকে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস জানিয়েছে, কুয়েতে অবস্থিত নিজেদের দূতাবাস আংশিক বা সম্পূর্ণ খালি করার প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে উপসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে মার্কিন ও মিত্র দেশগুলোর সামরিক উপস্থিতি এবং পাল্টাপাল্টি হুমকির কারণে পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

আরো পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ পড়ুন

বাহরাইনে ড্রোন হামলা, লক্ষ্য ছিল মার্কিন সেনাদের আবাসস্থল

বাহরাইনে ড্রোন হামলা, লক্ষ্য ছিল মার্কিন সেনাদের আবাসস্থল

মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশ বাহরাইনের রাজধানী মানামায় একটি হোটেলে ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। স্থানীয় ও আঞ্চলিক কয়েকটি অসমর্থিত সূত্রের দাবি, সেখানে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়েছে। ঘটনাটি ঘিরে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। খবরে বলা হয়েছে, হামলার আগে শুক্রবার বাংলাদেশ সময় সকাল ৬টার দিকে বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রাজধানীতে সতর্কতামূলক সাইরেন বাজানোর বিষয়টি নিশ্চিত করে। সে সময় কর্তৃপক্ষ নাগরিকদের পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত নিরাপদ স্থানে আশ্রয়ে থাকার আহ্বান জানায়। এতে বোঝা যায় যে সম্ভাব্য নিরাপত্তা হুমকি সম্পর্কে আগেই সতর্ক ছিল দেশটির প্রশাসন। স্থানীয় একটি সূত্রের বরাতে জানা গেছে, রাজধানী মানামার জুফফাইর এলাকায় অবস্থিত একটি হোটেল বা আবাসিক ভবন লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালানো হয়। ওই এলাকাতেই মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর অবস্থিত এবং সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের বহু সামরিক সদস্য অবস্থান করেন। ধারণা করা হচ্ছে, হামলার লক্ষ্য ছিল ওই নৌবহরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সেনাদের আবাসস্থল। তবে হামলার বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানায়নি বাহরাইনের সরকার বা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্তৃপক্ষ। হতাহতের কোনো তথ্যও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। একইভাবে ইরানের পক্ষ থেকেও এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই হামলার খবর নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি এবং ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক উত্তেজনার কারণে ঘটনাটিকে ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ...

আরো পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ পড়ুন

ইতিকাফে কী কী আমল করবেন?

ইতিকাফে কী কী আমল করবেন?

রমজান মাসের শেষ দশক মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বরকতময় সময়। এই সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হলো ইতিকাফ। ইতিকাফের অর্থ হলো দুনিয়ার ব্যস্ততা থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে মসজিদে অবস্থান করা এবং ইবাদতে মগ্ন থাকা। ইসলামী চিন্তাবিদরা বলেন, রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফে বসার সুযোগ পাওয়া একজন মুসলমানের জন্য বিরাট নেয়ামত। ইতিকাফের সময়টিকে সর্বোত্তমভাবে কাজে লাগাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো কুরআন তিলাওয়াত। অনেক মুসলমানই রমজানের প্রথম অংশে কাজ, ব্যবসা বা পারিবারিক ব্যস্ততার কারণে কুরআনের জন্য পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেন না। তাই শেষ দশকের এই সময়টিকে কুরআনের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ হিসেবে নেওয়া যায়। অনেকে চেষ্টা করেন এই দশ দিনের মধ্যেই অন্তত একবার কুরআন খতম করার। ইতিকাফের সময় আল্লাহর কাছে দোয়া করা এবং ইস্তিগফার করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আলেমদের মতে, এই সময়টি নিজের গুনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনার অন্যতম সেরা সুযোগ। ইতিকাফে বসে বেশি বেশি তওবা, ইস্তিগফার এবং কান্নাভেজা দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত। একই সঙ্গে নিজের পরিবার, সমাজ এবং সমগ্র মুসলিম উম্মাহর কল্যাণের জন্য দোয়া করা উত্তম। কারণ এই সময়ের কোনো রাত যদি লাইলাতুল কদর হয়ে যায়, তাহলে সেই দোয়া কবুল হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফের গুরুত্ব ও ফজিলত এছাড়া ইতিকাফের সময় বেশি বেশি নফল ইবাদত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। শুধু ফরজ...

আরো পড়ুন
ট্যাগ

পরবর্তী সংবাদ পড়ুন

রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফের গুরুত্ব ও ফজিলত

রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফের গুরুত্ব ও ফজিলত

রমজান মাসের শেষ দশকে মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ফজিলতপূর্ণ একটি ইবাদত হলো ইতিকাফ। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে দুনিয়ার সব ব্যস্ততা থেকে নিজেকে দূরে রেখে মসজিদে অবস্থান করে ইবাদতে নিমগ্ন থাকার এই আমলকে ইসলামে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আলেমরা বলেন, ইতিকাফ মানুষের আত্মশুদ্ধি, তাকওয়া অর্জন এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক অনন্য সুযোগ। ইতিকাফের মূল উদ্দেশ্য হলো দুনিয়াবি ব্যস্ততা থেকে দূরে সরে আল্লাহর ইবাদতে সম্পূর্ণ মনোযোগ দেওয়া। মানুষের দৈনন্দিন জীবনে পরিবার, সমাজ, কাজ এবং নানা দায়িত্বের কারণে অনেক সময় গভীরভাবে ইবাদতে মনোনিবেশ করা সম্ভব হয় না। ইতিকাফ সেই সুযোগকে উন্মুক্ত করে দেয়, যেখানে একজন মুসলমান নিরবচ্ছিন্নভাবে আল্লাহর স্মরণ, নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত এবং দোয়া-ইস্তিগফারে সময় ব্যয় করতে পারেন। ১৭ রমজান: বদর যুদ্ধের ঐতিহাসিক দিন। কুরআনুল কারিমেও ইতিকাফের উল্লেখ রয়েছে। সূরা আল-বাকারা ১২৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, তিনি হযরত ইবরাহিম (আ.) ও হযরত ইসমাঈল (আ.)-কে নির্দেশ দিয়েছিলেন যেন তাঁরা তাঁর ঘরকে তাওয়াফকারী, ইতিকাফকারী এবং রুকু-সিজদাকারীদের জন্য পবিত্র রাখেন। এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, ইতিকাফের বিধান ইসলামের প্রাচীন ঐতিহ্যের অংশ। হাদিসেও ইতিকাফের গুরুত্ব সম্পর্কে বহু বর্ণনা রয়েছে। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) মদিনায় হিজরতের পর প্রায় প্রতি বছরই রমজানের শেষ দশ দিন ইতিকাফ করতেন। একবার বিশেষ কারণে ইতিকাফ করতে না পারায় পরের বছর তিনি বিশ দিন ইতিকাফ করেছিলেন বলে হাদিসে উল্লেখ...

আরো পড়ুন
ট্যাগ

ব্যবসায়ী থেকে গভর্নর: বাংলাদেশ ব্যাংকে নতুন অধ্যায়, নাকি স্বার্থের সংঘাতের শঙ্কা?

প্রকাশিত হয়েছে: ১১:০৩:৪২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংক–এর গভর্নর পদে একজন সক্রিয় ব্যবসায়ীর নিয়োগ দেশের অর্থনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সরকার চার বছরের জন্য মো. মোস্তাকুর রহমানকে গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। তিনি পোশাক ও রিয়েল এস্টেট খাতের ব্যবসায়ী, হেরা সোয়েটার্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং বিজিএমইএর বাংলাদেশ ব্যাংক–বিষয়ক স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো আপাদমস্তক ব্যবসায়ী কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হলেন। ফলে একদিকে যেমন ‘ব্যবসায়িক বাস্তবতা বোঝেন’—এমন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে তেমনি ‘স্বার্থের সংঘাত’ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে নীতি নির্ধারণী মহলে।

বিশ্বে ব্যবসায়ী থেকে গভর্নর হওয়ার ঘটনা বিরল। তবে আন্তর্জাতিক আলোচনায় সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ ছিলেন মার্ক কার্নি। তিনি ২০০৮-২০১৩ পর্যন্ত ব্যাংক অব কানাডা–এর গভর্নর এবং পরে ২০১৩-২০২০ পর্যন্ত ব্যাংক অব ইংল্যান্ড–এর গভর্নর ছিলেন। বিশ্বমন্দা-পরবর্তী সময়ে কানাডার অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখায় তার ভূমিকা প্রশংসিত হয়।

তবে কার্নি ছিলেন আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন পেশাদার। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে নতুন গভর্নরের পটভূমি সরাসরি করপোরেট ও রপ্তানি ব্যবসাকেন্দ্রিক—যা বিতর্কের মূল কেন্দ্রবিন্দু।

বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার, ১৯৭২ অনুযায়ী, গভর্নর নিয়োগের ক্ষমতা সরকারের হাতে এবং মেয়াদ চার বছর। নির্দিষ্ট যোগ্যতার মানদণ্ড আইনে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই। ২০২৪ সালে বয়সসীমাও তুলে নেওয়া হয়।

আইনের এই নমনীয়তা সরকারের পছন্দকে মুখ্য করে তোলে। তবে উন্নত দেশগুলোতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রধান নিয়োগে আর্থিক বাজার, মুদ্রানীতি ও আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থায় অভিজ্ঞতা প্রায় অলিখিত বাধ্যবাধকতা।

স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নররা মূলত আমলা, অর্থনীতিবিদ বা পেশাদার ব্যাংকার ছিলেন। সর্বশেষ গভর্নর আহসান এইচ মনসুর ছিলেন আইএমএফের সাবেক কর্মকর্তা। তার আগে ফজলে কবির, আতিউর রহমানসহ অধিকাংশ গভর্নর অর্থনীতি ও নীতি-প্রশাসনের পটভূমি থেকে এসেছেন।

এই ধারাবাহিকতার বাইরে গিয়ে এবার একজন ব্যবসায়ীকে দায়িত্ব দেওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে—নীতিনির্ধারণে কি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি আসবে, নাকি বাড়বে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর প্রভাব?

নিয়োগের আগে মোস্তাকুর রহমানের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ‘হেরা সোয়েটার্স লিমিটেড’-এর ৮৯ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিল হয়েছে বলে জানা গেছে। ব্যাংকিং খাতের কয়েকজন ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রশ্ন তুলেছেন—যিনি নিজ প্রতিষ্ঠানের জন্য বিশেষ সুবিধা পেয়েছেন, তিনি কি নিরপেক্ষভাবে খেলাপি ঋণসংক্রান্ত কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন?

সরকারি প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, তিনি অন্য সব প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের সঙ্গে কর্ম–সম্পর্ক ত্যাগের শর্তে নিয়োগ পেয়েছেন। তবে বাস্তবে ব্যবসায়িক প্রভাবমুক্ত থাকা কতটা সম্ভব হবে—সেটি সময়ই বলবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল কাজ শুধু সুদের হার নির্ধারণ নয়; বরং—

  • মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ
  • মুদ্রা সরবরাহ ব্যবস্থাপনা
  • ব্যাংক তদারকি ও আর্থিক স্থিতিশীলতা
  • বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা
  • সরকারের অর্থনৈতিক পরামর্শদাতা হিসেবে কাজ

বিশ্ব অর্থনীতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতার গুরুত্ব নতুন করে প্রতিষ্ঠা করেন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের সাবেক চেয়ারম্যান পল ভলকার। রাজনৈতিক চাপের মুখেও কঠোর মুদ্রানীতির মাধ্যমে তিনি উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকে বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা এখন একটি স্বীকৃত নীতি।

জাতীয় নাগরিক পার্টির সাবেক যুগ্ম সদস্যসচিব ডা. তাসনিম জারা পাঁচটি প্রশ্ন তুলেছেন, যা মূলত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা ও জবাবদিহিকে ঘিরে:

  1. গভর্নর কি সরকারের সঙ্গে ভিন্নমত প্রকাশ করতে পারবেন?
  2. ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততা পুরোপুরি ত্যাগ করা হয়েছে কি?
  3. খেলাপি ঋণ সংকট মোকাবিলায় কী উদ্যোগ নেওয়া হবে?
  4. সুদের হার ও মুদ্রানীতিতে ধারাবাহিকতা থাকবে, নাকি পরিবর্তন আসবে?
  5. টাকার বিনিময় হার বাজারভিত্তিক থাকবে, নাকি নিয়ন্ত্রিত হবে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর নির্ভর করবে ভবিষ্যৎ নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপর।

বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে আস্থাহীনতা, খেলাপি ঋণের উচ্চ হার, মুদ্রাস্ফীতির চাপ এবং ডলারের অস্থিরতা বড় চ্যালেঞ্জ। নতুন গভর্নর ইতিমধ্যে ‘ট্রাস্ট বিল্ডিং’ ও সুদের হার কমানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আস্থা ফেরাতে হলে দরকার স্বচ্ছতা, কঠোর নজরদারি এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত সিদ্ধান্ত।

একজন ব্যবসায়ীকে গভর্নর নিয়োগ নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত। এটি যেমন বাস্তবমুখী অভিজ্ঞতা নিয়ে আসতে পারে, তেমনি নীতিনির্ধারণে স্বার্থের সংঘাতের ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে এখন দ্বৈত পরীক্ষা—একদিকে আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, অন্যদিকে প্রমাণ করা যে প্রতিষ্ঠানটি রাজনৈতিক ও গোষ্ঠীগত প্রভাবের ঊর্ধ্বে থেকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে সক্ষম।

আগামী মাসগুলোর নীতিগত সিদ্ধান্তই বলে দেবে—এটি কি নতুন যুগের সূচনা, নাকি বিতর্কিত এক অধ্যায়ের শুরু।