০৩:১৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৬ মার্চ ২০২৬, ২২ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত: মধ্যপ্রাচ্যে নতুন ভূরাজনৈতিক অধ্যায়?

আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত: মধ্যপ্রাচ্যে নতুন ভূরাজনৈতিক অধ্যায়?

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা  আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ বিমান হামলায় নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম। শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) তাঁর বাসভবনে পরিচালিত হামলায় তিনি নিহত হন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর।

এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ট ট্রাম্প ঘোষণা দেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে “বড় সামরিক অভিযান” শুরু করেছে এবং হামলায় খামেনি নিহত হয়েছেন। ইরানের আধা-সরকারি তাসনিম বার্তা সংস্থা জানায়, একই হামলায় খামেনির পরিবারের কয়েকজন সদস্যও প্রাণ হারিয়েছেন।

এই ঘটনা শুধু ইরানের রাজনীতিতেই নয়, গোটা মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

১৯৮৯ সালে ইসলামী বিপ্লবের নেতা  রুহল্লাহ খামেনি এর মৃত্যুর পর খামেনি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব নেন। ১৯৭৯ সালের বিপ্লব-পরবর্তী ইসলামী প্রজাতন্ত্রে তিনি ছিলেন দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা।

তাঁর নেতৃত্বের বৈশিষ্ট্য ছিল ‘নিরাপত্তা-কেন্দ্রিক রাষ্ট্রদর্শন’। ১৯৮০-এর দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে পশ্চিমা দেশগুলোর ইরাক সমর্থন তাঁর রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বে গভীর প্রভাব ফেলে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি দীর্ঘস্থায়ী অবিশ্বাস ও প্রতিরোধমূলক নীতি তাঁর শাসনের ভিত্তি হয়ে ওঠে।

খামেনির আমলে ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) শুধু সামরিক শক্তিই নয়, অর্থনীতি ও রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামকে পরিণত হয়। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার এবং অভ্যন্তরীণ দমননীতিতে এই বাহিনীর ভূমিকা ছিল কেন্দ্রীয়।

পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে তিনি “প্রতিরোধ অর্থনীতি” নীতি গ্রহণ করেন, যার লক্ষ্য ছিল স্বনির্ভরতা বৃদ্ধি ও বাইরের চাপ মোকাবিলা। তবে সমালোচকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি নিষেধাজ্ঞা ও ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতার কারণে অর্থনৈতিক সংকট তীব্র হয়, যা পরবর্তী সময়ে গণঅসন্তোষের জন্ম দেয়।

২০১৫ সালে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা লাঘবের লক্ষ্যে ইরান বিশ্ব শক্তি গুলোর সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি (জেসিপিওএ) স্বাক্ষর করে। খামেনি আলোচনার অনুমোদন দিলেও তিনি এটিকে কৌশলগত সমঝোতা হিসেবে দেখেছিলেন, পূর্ণ স্বাভাবিকীকরণ হিসেবে নয়।

২০১৮ সালে ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রকে চুক্তি থেকে সরিয়ে নিলে সম্পর্ক আবার তীব্র বৈরিতায় রূপ নেয়। ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বাড়ায়, যদিও খামেনি বারবার দাবি করেন, দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ।

খামেনির অন্যতম কৌশল ছিল তথাকথিত “প্রতিরোধ অক্ষ” গড়ে তোলা—যার মাধ্যমে লেবানন, সিরিয়া, ফিলিস্তিন ও ইয়েমেনে মিত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপন করা হয়। এই নেটওয়ার্ক ইরানকে সরাসরি যুদ্ধ ছাড়াই আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দেয়।

তবে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর গাজা ও লেবাননে সংঘাত তীব্র হয় এবং ২০২৪ সালে সিরিয়ায় রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে ইরানের আঞ্চলিক অবস্থান দুর্বল হতে শুরু করে।

২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েলের সরাসরি হামলা এবং পরবর্তী ১২ দিনের সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালালে উত্তেজনা চরমে পৌঁছে।

অর্থনৈতিক মন্দা, মুদ্রার অবমূল্যায়ন ও বেকারত্বের কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরানে ব্যাপক বিক্ষোভ দেখা যায়। ২০০৯ সালের গ্রীন মুভমেন্ট এবং ২০২২ সালের নারী অধিকার আন্দোলন তাঁর শাসনের বড় চ্যালেঞ্জ ছিল।

খামেনির মৃত্যুর ফলে এখন প্রশ্ন উঠেছে—ইরানের পরবর্তী নেতৃত্ব কে গ্রহণ করবে এবং রাষ্ট্রের ক্ষমতার ভারসাম্য কীভাবে পুনর্গঠিত হবে?

বিশ্লেষকদের মতে, সম্ভাব্য ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, আইআরজিসির প্রভাব বৃদ্ধি এবং যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল সম্পর্কের নতুন মাত্রা মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে বড় রদবদল আনতে পারে।

ট্রাম্প তাঁর ভাষণে সরাসরি ইরানি জনগণের উদ্দেশে শাসন পরিবর্তনের আহ্বান জানান। অন্যদিকে তেহরান এই হামলাকে “আগ্রাসন” হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।

এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর—ইরান কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানায় এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলো কোন অবস্থান নেয়।

আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যু শুধু একটি যুগের অবসান নয়; এটি ইরানের রাজনৈতিক কাঠামো, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং বৈশ্বিক কূটনীতিতে নতুন অনিশ্চয়তার সূচনা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

ট্যাগ

সৌদি আরব ও কুয়েত লক্ষ্য করে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ

সৌদি আরব ও কুয়েত লক্ষ্য করে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার নতুন অধ্যায় তৈরি হয়েছে। সৌদি আরব ও কুয়েতকে লক্ষ্য করে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে ইরান বলে অভিযোগ উঠেছে। শুক্রবার মধ্যরাতের পর এসব মিসাইল ছোড়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে সৌদি আরব ও কুয়েত উভয় দেশই জানিয়েছে, তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হামলাগুলো সফলভাবে প্রতিহত করেছে। সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী রিয়াদের কাছে অবস্থিত প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিকে লক্ষ্য করে তিনটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়। কিন্তু লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছানোর আগেই সৌদি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মিসাইলগুলো ধ্বংস করে দেয়। এতে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে কুয়েতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, একটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র তাদের আকাশসীমায় প্রবেশ করেছিল। দ্রুত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করে সেটিকে ধ্বংস করা হয়। তবে প্রতিরক্ষা মিসাইলের ধ্বংসাবশেষ একটি এলাকায় পড়ে সামান্য ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে বলে জানানো হয়েছে। যদিও এতে বড় ধরনের কোনো ক্ষতি বা প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি। এদিকে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস জানিয়েছে, কুয়েতে অবস্থিত নিজেদের দূতাবাস আংশিক বা সম্পূর্ণ খালি করার প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে উপসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে মার্কিন ও মিত্র দেশগুলোর সামরিক উপস্থিতি এবং পাল্টাপাল্টি হুমকির কারণে পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

আরো পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ পড়ুন

বাহরাইনে ড্রোন হামলা, লক্ষ্য ছিল মার্কিন সেনাদের আবাসস্থল

বাহরাইনে ড্রোন হামলা, লক্ষ্য ছিল মার্কিন সেনাদের আবাসস্থল

মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশ বাহরাইনের রাজধানী মানামায় একটি হোটেলে ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। স্থানীয় ও আঞ্চলিক কয়েকটি অসমর্থিত সূত্রের দাবি, সেখানে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়েছে। ঘটনাটি ঘিরে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। খবরে বলা হয়েছে, হামলার আগে শুক্রবার বাংলাদেশ সময় সকাল ৬টার দিকে বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রাজধানীতে সতর্কতামূলক সাইরেন বাজানোর বিষয়টি নিশ্চিত করে। সে সময় কর্তৃপক্ষ নাগরিকদের পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত নিরাপদ স্থানে আশ্রয়ে থাকার আহ্বান জানায়। এতে বোঝা যায় যে সম্ভাব্য নিরাপত্তা হুমকি সম্পর্কে আগেই সতর্ক ছিল দেশটির প্রশাসন। স্থানীয় একটি সূত্রের বরাতে জানা গেছে, রাজধানী মানামার জুফফাইর এলাকায় অবস্থিত একটি হোটেল বা আবাসিক ভবন লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালানো হয়। ওই এলাকাতেই মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর অবস্থিত এবং সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের বহু সামরিক সদস্য অবস্থান করেন। ধারণা করা হচ্ছে, হামলার লক্ষ্য ছিল ওই নৌবহরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সেনাদের আবাসস্থল। তবে হামলার বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানায়নি বাহরাইনের সরকার বা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্তৃপক্ষ। হতাহতের কোনো তথ্যও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। একইভাবে ইরানের পক্ষ থেকেও এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই হামলার খবর নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি এবং ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক উত্তেজনার কারণে ঘটনাটিকে ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ...

আরো পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ পড়ুন

ইতিকাফে কী কী আমল করবেন?

ইতিকাফে কী কী আমল করবেন?

রমজান মাসের শেষ দশক মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বরকতময় সময়। এই সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হলো ইতিকাফ। ইতিকাফের অর্থ হলো দুনিয়ার ব্যস্ততা থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে মসজিদে অবস্থান করা এবং ইবাদতে মগ্ন থাকা। ইসলামী চিন্তাবিদরা বলেন, রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফে বসার সুযোগ পাওয়া একজন মুসলমানের জন্য বিরাট নেয়ামত। ইতিকাফের সময়টিকে সর্বোত্তমভাবে কাজে লাগাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো কুরআন তিলাওয়াত। অনেক মুসলমানই রমজানের প্রথম অংশে কাজ, ব্যবসা বা পারিবারিক ব্যস্ততার কারণে কুরআনের জন্য পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেন না। তাই শেষ দশকের এই সময়টিকে কুরআনের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ হিসেবে নেওয়া যায়। অনেকে চেষ্টা করেন এই দশ দিনের মধ্যেই অন্তত একবার কুরআন খতম করার। ইতিকাফের সময় আল্লাহর কাছে দোয়া করা এবং ইস্তিগফার করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আলেমদের মতে, এই সময়টি নিজের গুনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনার অন্যতম সেরা সুযোগ। ইতিকাফে বসে বেশি বেশি তওবা, ইস্তিগফার এবং কান্নাভেজা দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত। একই সঙ্গে নিজের পরিবার, সমাজ এবং সমগ্র মুসলিম উম্মাহর কল্যাণের জন্য দোয়া করা উত্তম। কারণ এই সময়ের কোনো রাত যদি লাইলাতুল কদর হয়ে যায়, তাহলে সেই দোয়া কবুল হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফের গুরুত্ব ও ফজিলত এছাড়া ইতিকাফের সময় বেশি বেশি নফল ইবাদত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। শুধু ফরজ...

আরো পড়ুন
ট্যাগ

পরবর্তী সংবাদ পড়ুন

রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফের গুরুত্ব ও ফজিলত

রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফের গুরুত্ব ও ফজিলত

রমজান মাসের শেষ দশকে মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ফজিলতপূর্ণ একটি ইবাদত হলো ইতিকাফ। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে দুনিয়ার সব ব্যস্ততা থেকে নিজেকে দূরে রেখে মসজিদে অবস্থান করে ইবাদতে নিমগ্ন থাকার এই আমলকে ইসলামে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আলেমরা বলেন, ইতিকাফ মানুষের আত্মশুদ্ধি, তাকওয়া অর্জন এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক অনন্য সুযোগ। ইতিকাফের মূল উদ্দেশ্য হলো দুনিয়াবি ব্যস্ততা থেকে দূরে সরে আল্লাহর ইবাদতে সম্পূর্ণ মনোযোগ দেওয়া। মানুষের দৈনন্দিন জীবনে পরিবার, সমাজ, কাজ এবং নানা দায়িত্বের কারণে অনেক সময় গভীরভাবে ইবাদতে মনোনিবেশ করা সম্ভব হয় না। ইতিকাফ সেই সুযোগকে উন্মুক্ত করে দেয়, যেখানে একজন মুসলমান নিরবচ্ছিন্নভাবে আল্লাহর স্মরণ, নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত এবং দোয়া-ইস্তিগফারে সময় ব্যয় করতে পারেন। ১৭ রমজান: বদর যুদ্ধের ঐতিহাসিক দিন। কুরআনুল কারিমেও ইতিকাফের উল্লেখ রয়েছে। সূরা আল-বাকারা ১২৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, তিনি হযরত ইবরাহিম (আ.) ও হযরত ইসমাঈল (আ.)-কে নির্দেশ দিয়েছিলেন যেন তাঁরা তাঁর ঘরকে তাওয়াফকারী, ইতিকাফকারী এবং রুকু-সিজদাকারীদের জন্য পবিত্র রাখেন। এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, ইতিকাফের বিধান ইসলামের প্রাচীন ঐতিহ্যের অংশ। হাদিসেও ইতিকাফের গুরুত্ব সম্পর্কে বহু বর্ণনা রয়েছে। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) মদিনায় হিজরতের পর প্রায় প্রতি বছরই রমজানের শেষ দশ দিন ইতিকাফ করতেন। একবার বিশেষ কারণে ইতিকাফ করতে না পারায় পরের বছর তিনি বিশ দিন ইতিকাফ করেছিলেন বলে হাদিসে উল্লেখ...

আরো পড়ুন
ট্যাগ

আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত: মধ্যপ্রাচ্যে নতুন ভূরাজনৈতিক অধ্যায়?

প্রকাশিত হয়েছে: ১২:১০:০২ অপরাহ্ন, রবিবার, ১ মার্চ ২০২৬

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা  আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ বিমান হামলায় নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম। শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) তাঁর বাসভবনে পরিচালিত হামলায় তিনি নিহত হন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর।

এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ট ট্রাম্প ঘোষণা দেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে “বড় সামরিক অভিযান” শুরু করেছে এবং হামলায় খামেনি নিহত হয়েছেন। ইরানের আধা-সরকারি তাসনিম বার্তা সংস্থা জানায়, একই হামলায় খামেনির পরিবারের কয়েকজন সদস্যও প্রাণ হারিয়েছেন।

এই ঘটনা শুধু ইরানের রাজনীতিতেই নয়, গোটা মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

১৯৮৯ সালে ইসলামী বিপ্লবের নেতা  রুহল্লাহ খামেনি এর মৃত্যুর পর খামেনি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব নেন। ১৯৭৯ সালের বিপ্লব-পরবর্তী ইসলামী প্রজাতন্ত্রে তিনি ছিলেন দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা।

তাঁর নেতৃত্বের বৈশিষ্ট্য ছিল ‘নিরাপত্তা-কেন্দ্রিক রাষ্ট্রদর্শন’। ১৯৮০-এর দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে পশ্চিমা দেশগুলোর ইরাক সমর্থন তাঁর রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বে গভীর প্রভাব ফেলে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি দীর্ঘস্থায়ী অবিশ্বাস ও প্রতিরোধমূলক নীতি তাঁর শাসনের ভিত্তি হয়ে ওঠে।

খামেনির আমলে ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) শুধু সামরিক শক্তিই নয়, অর্থনীতি ও রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামকে পরিণত হয়। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার এবং অভ্যন্তরীণ দমননীতিতে এই বাহিনীর ভূমিকা ছিল কেন্দ্রীয়।

পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে তিনি “প্রতিরোধ অর্থনীতি” নীতি গ্রহণ করেন, যার লক্ষ্য ছিল স্বনির্ভরতা বৃদ্ধি ও বাইরের চাপ মোকাবিলা। তবে সমালোচকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি নিষেধাজ্ঞা ও ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতার কারণে অর্থনৈতিক সংকট তীব্র হয়, যা পরবর্তী সময়ে গণঅসন্তোষের জন্ম দেয়।

২০১৫ সালে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা লাঘবের লক্ষ্যে ইরান বিশ্ব শক্তি গুলোর সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি (জেসিপিওএ) স্বাক্ষর করে। খামেনি আলোচনার অনুমোদন দিলেও তিনি এটিকে কৌশলগত সমঝোতা হিসেবে দেখেছিলেন, পূর্ণ স্বাভাবিকীকরণ হিসেবে নয়।

২০১৮ সালে ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রকে চুক্তি থেকে সরিয়ে নিলে সম্পর্ক আবার তীব্র বৈরিতায় রূপ নেয়। ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বাড়ায়, যদিও খামেনি বারবার দাবি করেন, দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ।

খামেনির অন্যতম কৌশল ছিল তথাকথিত “প্রতিরোধ অক্ষ” গড়ে তোলা—যার মাধ্যমে লেবানন, সিরিয়া, ফিলিস্তিন ও ইয়েমেনে মিত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপন করা হয়। এই নেটওয়ার্ক ইরানকে সরাসরি যুদ্ধ ছাড়াই আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দেয়।

তবে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর গাজা ও লেবাননে সংঘাত তীব্র হয় এবং ২০২৪ সালে সিরিয়ায় রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে ইরানের আঞ্চলিক অবস্থান দুর্বল হতে শুরু করে।

২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েলের সরাসরি হামলা এবং পরবর্তী ১২ দিনের সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালালে উত্তেজনা চরমে পৌঁছে।

অর্থনৈতিক মন্দা, মুদ্রার অবমূল্যায়ন ও বেকারত্বের কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরানে ব্যাপক বিক্ষোভ দেখা যায়। ২০০৯ সালের গ্রীন মুভমেন্ট এবং ২০২২ সালের নারী অধিকার আন্দোলন তাঁর শাসনের বড় চ্যালেঞ্জ ছিল।

খামেনির মৃত্যুর ফলে এখন প্রশ্ন উঠেছে—ইরানের পরবর্তী নেতৃত্ব কে গ্রহণ করবে এবং রাষ্ট্রের ক্ষমতার ভারসাম্য কীভাবে পুনর্গঠিত হবে?

বিশ্লেষকদের মতে, সম্ভাব্য ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, আইআরজিসির প্রভাব বৃদ্ধি এবং যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল সম্পর্কের নতুন মাত্রা মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে বড় রদবদল আনতে পারে।

ট্রাম্প তাঁর ভাষণে সরাসরি ইরানি জনগণের উদ্দেশে শাসন পরিবর্তনের আহ্বান জানান। অন্যদিকে তেহরান এই হামলাকে “আগ্রাসন” হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।

এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর—ইরান কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানায় এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলো কোন অবস্থান নেয়।

আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যু শুধু একটি যুগের অবসান নয়; এটি ইরানের রাজনৈতিক কাঠামো, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং বৈশ্বিক কূটনীতিতে নতুন অনিশ্চয়তার সূচনা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।