
২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি শনিবার ইরানের ওপর মার্কিন–ইসরায়েলি যৌথ হামলা শুরু হওয়ার পরপরই বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়। বাণিজ্যিক সূত্র জানায়, কয়েকটি বড় তেল ব্যবসায়ী কোম্পানি গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি পরিবহন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখে। একটি শীর্ষ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মকর্তা বলেন, “আমাদের জাহাজ কয়েকদিন সেখানেই অপেক্ষায় থাকবে।”
কৌশলগতভাবে সংবেদনশীল জলপথ
হরমুজ প্রণালী ইরান ও ওমানের মাঝখানে অবস্থিত। এটি পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। প্রায় ৫০ কিলোমিটার প্রস্থ এবং তুলনামূলকভাবে অগভীর নাব্যতার কারণে এটি বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সামুদ্রিক চোকপয়েন্টগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত।
এই প্রণালীর আশপাশে রয়েছে ইরানের হরমুজ, কেশম ও লারাক দ্বীপপুঞ্জ। অন্যদিকে ওমানের উপকূলে অবস্থিত মুসান্দাম উপদ্বীপ, যা সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভূখণ্ড দ্বারা ওমানের মূল অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন। উপসাগরীয় উপকূলে গ্রেটার টুনব, লেসার টুনব ও আবু মুসা দ্বীপ নিয়েও ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে।
তেল ও গ্যাসের লাইফলাইন
মার্কিন জ্বালানি তথ্য প্রশাসন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শক্তি তথ্য প্রশাসন (ইআইএ)- এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে প্রতিদিন প্রায় ২০ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়েছে, যা বৈশ্বিক তেল ব্যবহারের প্রায় ২০ শতাংশ। একই সঙ্গে বিশ্বের মোট তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথেই গেছে, যার বড় অংশ কাতার থেকে এশিয়ার বাজারে।
EIA বলছে, ২০২৪ সালে হরমুজ দিয়ে যাওয়া LNG-এর ৮৩ শতাংশই এশিয়ার জন্য নির্ধারিত ছিল। ফলে প্রণালী বন্ধ বা আংশিকভাবে ব্যাহত হলে সবচেয়ে বড় ধাক্কা লাগবে এশীয় অর্থনীতিগুলোতে।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, অল্প সময়ের জন্যও যদি জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়, তবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের দাম দ্রুত বেড়ে যেতে পারে। এর প্রভাব পড়বে আমদানি-নির্ভর দেশগুলোতে, বিশেষ করে দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ায়।
বিকল্প পথ ও সীমাবদ্ধতা
EIA জানিয়েছে, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের কাছে বিকল্প পাইপলাইন অবকাঠামো রয়েছে, যা প্রতিদিন প্রায় ২.৬ মিলিয়ন ব্যারেল পর্যন্ত পরিবহন করতে পারে। তবে সেটি পূর্ণ সক্ষমতায় সচরাচর পরিচালিত হয় না এবং পুরো হরমুজ নির্ভর রপ্তানির ক্ষতি পূরণ করার মতো যথেষ্ট নয়।
অন্যদিকে, হরমুজ দিয়ে ইরানের নিজস্ব তেল রপ্তানিও হয়। ফলে দীর্ঘমেয়াদি অবরোধ ইরানের অর্থনীতিতেও চাপ সৃষ্টি করবে, বিশেষ করে যখন দেশটি আগে থেকেই কঠোর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মুখে রয়েছে।
সামরিক উত্তেজনার ইতিহাস
হরমুজ প্রণালী কার্যত নিয়ন্ত্রণ করে ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড কর্পসের নৌবাহিনী। অতীতে একাধিকবার এই জলপথে জাহাজ আটক, ড্রোন ভূপাতিত ও ট্যাঙ্কার জব্দের ঘটনা ঘটেছে। ১৯৮০–৮৮ সালের ইরান–ইরাক যুদ্ধের সময় “ট্যাঙ্কার যুদ্ধ” নামে পরিচিত অধ্যায়ে ৫০০-র বেশি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছিল।
১৯৮৮ সালে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস স্যামুয়েল বি. রবার্টস একটি সামুদ্রিক মাইনে আঘাত পায়। একই বছর জুলাইয়ে ইরান এয়ারের একটি এয়ারবাস এ৩০০ মার্কিন ফ্রিগেট ইউএসএস ভিনসেনেস থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রে ভূপাতিত হয়, এতে ২৯০ জন নিহত হন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও উত্তেজনা থামেনি। ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে আসার পর জলপথে একাধিক ঘটনা ঘটে। ২০২১ সালে ওমান উপসাগরে একটি তেল ট্যাঙ্কারে হামলায় দুজন নিহত হন। ২০২৪ সালের এপ্রিলে ইরান হরমুজের কাছে একটি পর্তুগিজ পতাকাবাহী কন্টেইনার জাহাজ আটক করে।
বর্তমান প্রেক্ষাপট
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শুরুতেও একটি মার্কিন তেল ট্যাঙ্কারকে থামার নির্দেশ দেওয়ার ঘটনা ঘটে, যদিও মার্কিন নৌবাহিনীর পাহারায় সেটি যাত্রা অব্যাহত রাখে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক যৌথ হামলার পর হরমুজ প্রণালী ঘিরে উত্তেজনা নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। এখন প্রশ্ন, এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ খোলা থাকবে নাকি আঞ্চলিক সংঘাত বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে বড় ধরনের ধাক্কা দেবে। পরিস্থিতি কোন দিকে গড়ায়, তার ওপর নির্ভর করছে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বিশ্ব অর্থনীতিরও স্থিতিশীলতা।
সমাচার বিশ্ব নিউজ ডেক্স 



















