০৩:০১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৬ মার্চ ২০২৬, ২২ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

হরমুজ প্রণালী ঘিরে উত্তেজনা, বাজারে দামের আশঙ্কা

হরমুজ প্রণালী ঘিরে উত্তেজনা, বাজারে দামের আশঙ্কা

২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি শনিবার ইরানের ওপর মার্কিন–ইসরায়েলি যৌথ হামলা শুরু হওয়ার পরপরই বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়। বাণিজ্যিক সূত্র জানায়, কয়েকটি বড় তেল ব্যবসায়ী কোম্পানি গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি পরিবহন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখে। একটি শীর্ষ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মকর্তা বলেন, “আমাদের জাহাজ কয়েকদিন সেখানেই অপেক্ষায় থাকবে।”

কৌশলগতভাবে সংবেদনশীল জলপথ

হরমুজ প্রণালী ইরান ও ওমানের মাঝখানে অবস্থিত। এটি পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। প্রায় ৫০ কিলোমিটার প্রস্থ এবং তুলনামূলকভাবে অগভীর নাব্যতার কারণে এটি বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সামুদ্রিক চোকপয়েন্টগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত।

এই প্রণালীর আশপাশে রয়েছে ইরানের হরমুজ, কেশম ও লারাক দ্বীপপুঞ্জ। অন্যদিকে ওমানের উপকূলে অবস্থিত মুসান্দাম উপদ্বীপ, যা সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভূখণ্ড দ্বারা ওমানের মূল অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন। উপসাগরীয় উপকূলে গ্রেটার টুনব, লেসার টুনব ও আবু মুসা দ্বীপ নিয়েও ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে।

তেল ও গ্যাসের লাইফলাইন

মার্কিন জ্বালানি তথ্য প্রশাসন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শক্তি তথ্য প্রশাসন (ইআইএ)- এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে প্রতিদিন প্রায় ২০ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়েছে, যা বৈশ্বিক তেল ব্যবহারের প্রায় ২০ শতাংশ। একই সঙ্গে বিশ্বের মোট তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথেই গেছে, যার বড় অংশ কাতার থেকে এশিয়ার বাজারে।

EIA বলছে, ২০২৪ সালে হরমুজ দিয়ে যাওয়া LNG-এর ৮৩ শতাংশই এশিয়ার জন্য নির্ধারিত ছিল। ফলে প্রণালী বন্ধ বা আংশিকভাবে ব্যাহত হলে সবচেয়ে বড় ধাক্কা লাগবে এশীয় অর্থনীতিগুলোতে।

বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, অল্প সময়ের জন্যও যদি জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়, তবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের দাম দ্রুত বেড়ে যেতে পারে। এর প্রভাব পড়বে আমদানি-নির্ভর দেশগুলোতে, বিশেষ করে দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ায়।

বিকল্প পথ ও সীমাবদ্ধতা

EIA জানিয়েছে, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের কাছে বিকল্প পাইপলাইন অবকাঠামো রয়েছে, যা প্রতিদিন প্রায় ২.৬ মিলিয়ন ব্যারেল পর্যন্ত পরিবহন করতে পারে। তবে সেটি পূর্ণ সক্ষমতায় সচরাচর পরিচালিত হয় না এবং পুরো হরমুজ নির্ভর রপ্তানির ক্ষতি পূরণ করার মতো যথেষ্ট নয়।

অন্যদিকে, হরমুজ দিয়ে ইরানের নিজস্ব তেল রপ্তানিও হয়। ফলে দীর্ঘমেয়াদি অবরোধ ইরানের অর্থনীতিতেও চাপ সৃষ্টি করবে, বিশেষ করে যখন দেশটি আগে থেকেই কঠোর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মুখে রয়েছে।

সামরিক উত্তেজনার ইতিহাস

হরমুজ প্রণালী কার্যত নিয়ন্ত্রণ করে ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড কর্পসের নৌবাহিনী। অতীতে একাধিকবার এই জলপথে জাহাজ আটক, ড্রোন ভূপাতিত ও ট্যাঙ্কার জব্দের ঘটনা ঘটেছে। ১৯৮০–৮৮ সালের ইরান–ইরাক যুদ্ধের সময় “ট্যাঙ্কার যুদ্ধ” নামে পরিচিত অধ্যায়ে ৫০০-র বেশি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছিল।

১৯৮৮ সালে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস স্যামুয়েল বি. রবার্টস একটি সামুদ্রিক মাইনে আঘাত পায়। একই বছর জুলাইয়ে ইরান এয়ারের একটি এয়ারবাস এ৩০০ মার্কিন ফ্রিগেট ইউএসএস ভিনসেনেস থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রে ভূপাতিত হয়, এতে ২৯০ জন নিহত হন।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও উত্তেজনা থামেনি। ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে আসার পর জলপথে একাধিক ঘটনা ঘটে। ২০২১ সালে ওমান উপসাগরে একটি তেল ট্যাঙ্কারে হামলায় দুজন নিহত হন। ২০২৪ সালের এপ্রিলে ইরান হরমুজের কাছে একটি পর্তুগিজ পতাকাবাহী কন্টেইনার জাহাজ আটক করে।

বর্তমান প্রেক্ষাপট

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শুরুতেও একটি মার্কিন তেল ট্যাঙ্কারকে থামার নির্দেশ দেওয়ার ঘটনা ঘটে, যদিও মার্কিন নৌবাহিনীর পাহারায় সেটি যাত্রা অব্যাহত রাখে।

বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক যৌথ হামলার পর হরমুজ প্রণালী ঘিরে উত্তেজনা নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। এখন প্রশ্ন, এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ খোলা থাকবে নাকি আঞ্চলিক সংঘাত বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে বড় ধরনের ধাক্কা দেবে। পরিস্থিতি কোন দিকে গড়ায়, তার ওপর নির্ভর করছে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বিশ্ব অর্থনীতিরও স্থিতিশীলতা।

ট্যাগ

সৌদি আরব ও কুয়েত লক্ষ্য করে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ

সৌদি আরব ও কুয়েত লক্ষ্য করে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার নতুন অধ্যায় তৈরি হয়েছে। সৌদি আরব ও কুয়েতকে লক্ষ্য করে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে ইরান বলে অভিযোগ উঠেছে। শুক্রবার মধ্যরাতের পর এসব মিসাইল ছোড়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে সৌদি আরব ও কুয়েত উভয় দেশই জানিয়েছে, তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হামলাগুলো সফলভাবে প্রতিহত করেছে। সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী রিয়াদের কাছে অবস্থিত প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিকে লক্ষ্য করে তিনটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়। কিন্তু লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছানোর আগেই সৌদি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মিসাইলগুলো ধ্বংস করে দেয়। এতে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে কুয়েতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, একটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র তাদের আকাশসীমায় প্রবেশ করেছিল। দ্রুত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করে সেটিকে ধ্বংস করা হয়। তবে প্রতিরক্ষা মিসাইলের ধ্বংসাবশেষ একটি এলাকায় পড়ে সামান্য ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে বলে জানানো হয়েছে। যদিও এতে বড় ধরনের কোনো ক্ষতি বা প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি। এদিকে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস জানিয়েছে, কুয়েতে অবস্থিত নিজেদের দূতাবাস আংশিক বা সম্পূর্ণ খালি করার প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে উপসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে মার্কিন ও মিত্র দেশগুলোর সামরিক উপস্থিতি এবং পাল্টাপাল্টি হুমকির কারণে পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

আরো পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ পড়ুন

বাহরাইনে ড্রোন হামলা, লক্ষ্য ছিল মার্কিন সেনাদের আবাসস্থল

বাহরাইনে ড্রোন হামলা, লক্ষ্য ছিল মার্কিন সেনাদের আবাসস্থল

মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশ বাহরাইনের রাজধানী মানামায় একটি হোটেলে ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। স্থানীয় ও আঞ্চলিক কয়েকটি অসমর্থিত সূত্রের দাবি, সেখানে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়েছে। ঘটনাটি ঘিরে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। খবরে বলা হয়েছে, হামলার আগে শুক্রবার বাংলাদেশ সময় সকাল ৬টার দিকে বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রাজধানীতে সতর্কতামূলক সাইরেন বাজানোর বিষয়টি নিশ্চিত করে। সে সময় কর্তৃপক্ষ নাগরিকদের পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত নিরাপদ স্থানে আশ্রয়ে থাকার আহ্বান জানায়। এতে বোঝা যায় যে সম্ভাব্য নিরাপত্তা হুমকি সম্পর্কে আগেই সতর্ক ছিল দেশটির প্রশাসন। স্থানীয় একটি সূত্রের বরাতে জানা গেছে, রাজধানী মানামার জুফফাইর এলাকায় অবস্থিত একটি হোটেল বা আবাসিক ভবন লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালানো হয়। ওই এলাকাতেই মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর অবস্থিত এবং সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের বহু সামরিক সদস্য অবস্থান করেন। ধারণা করা হচ্ছে, হামলার লক্ষ্য ছিল ওই নৌবহরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সেনাদের আবাসস্থল। তবে হামলার বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানায়নি বাহরাইনের সরকার বা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্তৃপক্ষ। হতাহতের কোনো তথ্যও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। একইভাবে ইরানের পক্ষ থেকেও এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই হামলার খবর নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি এবং ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক উত্তেজনার কারণে ঘটনাটিকে ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ...

আরো পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ পড়ুন

ইতিকাফে কী কী আমল করবেন?

ইতিকাফে কী কী আমল করবেন?

রমজান মাসের শেষ দশক মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বরকতময় সময়। এই সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হলো ইতিকাফ। ইতিকাফের অর্থ হলো দুনিয়ার ব্যস্ততা থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে মসজিদে অবস্থান করা এবং ইবাদতে মগ্ন থাকা। ইসলামী চিন্তাবিদরা বলেন, রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফে বসার সুযোগ পাওয়া একজন মুসলমানের জন্য বিরাট নেয়ামত। ইতিকাফের সময়টিকে সর্বোত্তমভাবে কাজে লাগাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো কুরআন তিলাওয়াত। অনেক মুসলমানই রমজানের প্রথম অংশে কাজ, ব্যবসা বা পারিবারিক ব্যস্ততার কারণে কুরআনের জন্য পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেন না। তাই শেষ দশকের এই সময়টিকে কুরআনের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ হিসেবে নেওয়া যায়। অনেকে চেষ্টা করেন এই দশ দিনের মধ্যেই অন্তত একবার কুরআন খতম করার। ইতিকাফের সময় আল্লাহর কাছে দোয়া করা এবং ইস্তিগফার করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আলেমদের মতে, এই সময়টি নিজের গুনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনার অন্যতম সেরা সুযোগ। ইতিকাফে বসে বেশি বেশি তওবা, ইস্তিগফার এবং কান্নাভেজা দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত। একই সঙ্গে নিজের পরিবার, সমাজ এবং সমগ্র মুসলিম উম্মাহর কল্যাণের জন্য দোয়া করা উত্তম। কারণ এই সময়ের কোনো রাত যদি লাইলাতুল কদর হয়ে যায়, তাহলে সেই দোয়া কবুল হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফের গুরুত্ব ও ফজিলত এছাড়া ইতিকাফের সময় বেশি বেশি নফল ইবাদত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। শুধু ফরজ...

আরো পড়ুন
ট্যাগ

পরবর্তী সংবাদ পড়ুন

রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফের গুরুত্ব ও ফজিলত

রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফের গুরুত্ব ও ফজিলত

রমজান মাসের শেষ দশকে মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ফজিলতপূর্ণ একটি ইবাদত হলো ইতিকাফ। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে দুনিয়ার সব ব্যস্ততা থেকে নিজেকে দূরে রেখে মসজিদে অবস্থান করে ইবাদতে নিমগ্ন থাকার এই আমলকে ইসলামে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আলেমরা বলেন, ইতিকাফ মানুষের আত্মশুদ্ধি, তাকওয়া অর্জন এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক অনন্য সুযোগ। ইতিকাফের মূল উদ্দেশ্য হলো দুনিয়াবি ব্যস্ততা থেকে দূরে সরে আল্লাহর ইবাদতে সম্পূর্ণ মনোযোগ দেওয়া। মানুষের দৈনন্দিন জীবনে পরিবার, সমাজ, কাজ এবং নানা দায়িত্বের কারণে অনেক সময় গভীরভাবে ইবাদতে মনোনিবেশ করা সম্ভব হয় না। ইতিকাফ সেই সুযোগকে উন্মুক্ত করে দেয়, যেখানে একজন মুসলমান নিরবচ্ছিন্নভাবে আল্লাহর স্মরণ, নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত এবং দোয়া-ইস্তিগফারে সময় ব্যয় করতে পারেন। ১৭ রমজান: বদর যুদ্ধের ঐতিহাসিক দিন। কুরআনুল কারিমেও ইতিকাফের উল্লেখ রয়েছে। সূরা আল-বাকারা ১২৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, তিনি হযরত ইবরাহিম (আ.) ও হযরত ইসমাঈল (আ.)-কে নির্দেশ দিয়েছিলেন যেন তাঁরা তাঁর ঘরকে তাওয়াফকারী, ইতিকাফকারী এবং রুকু-সিজদাকারীদের জন্য পবিত্র রাখেন। এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, ইতিকাফের বিধান ইসলামের প্রাচীন ঐতিহ্যের অংশ। হাদিসেও ইতিকাফের গুরুত্ব সম্পর্কে বহু বর্ণনা রয়েছে। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) মদিনায় হিজরতের পর প্রায় প্রতি বছরই রমজানের শেষ দশ দিন ইতিকাফ করতেন। একবার বিশেষ কারণে ইতিকাফ করতে না পারায় পরের বছর তিনি বিশ দিন ইতিকাফ করেছিলেন বলে হাদিসে উল্লেখ...

আরো পড়ুন
ট্যাগ

হরমুজ প্রণালী ঘিরে উত্তেজনা, বাজারে দামের আশঙ্কা

প্রকাশিত হয়েছে: ০৫:০২:৪৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১ মার্চ ২০২৬

২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি শনিবার ইরানের ওপর মার্কিন–ইসরায়েলি যৌথ হামলা শুরু হওয়ার পরপরই বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়। বাণিজ্যিক সূত্র জানায়, কয়েকটি বড় তেল ব্যবসায়ী কোম্পানি গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি পরিবহন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখে। একটি শীর্ষ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মকর্তা বলেন, “আমাদের জাহাজ কয়েকদিন সেখানেই অপেক্ষায় থাকবে।”

কৌশলগতভাবে সংবেদনশীল জলপথ

হরমুজ প্রণালী ইরান ও ওমানের মাঝখানে অবস্থিত। এটি পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। প্রায় ৫০ কিলোমিটার প্রস্থ এবং তুলনামূলকভাবে অগভীর নাব্যতার কারণে এটি বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সামুদ্রিক চোকপয়েন্টগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত।

এই প্রণালীর আশপাশে রয়েছে ইরানের হরমুজ, কেশম ও লারাক দ্বীপপুঞ্জ। অন্যদিকে ওমানের উপকূলে অবস্থিত মুসান্দাম উপদ্বীপ, যা সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভূখণ্ড দ্বারা ওমানের মূল অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন। উপসাগরীয় উপকূলে গ্রেটার টুনব, লেসার টুনব ও আবু মুসা দ্বীপ নিয়েও ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে।

তেল ও গ্যাসের লাইফলাইন

মার্কিন জ্বালানি তথ্য প্রশাসন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শক্তি তথ্য প্রশাসন (ইআইএ)- এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে প্রতিদিন প্রায় ২০ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়েছে, যা বৈশ্বিক তেল ব্যবহারের প্রায় ২০ শতাংশ। একই সঙ্গে বিশ্বের মোট তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথেই গেছে, যার বড় অংশ কাতার থেকে এশিয়ার বাজারে।

EIA বলছে, ২০২৪ সালে হরমুজ দিয়ে যাওয়া LNG-এর ৮৩ শতাংশই এশিয়ার জন্য নির্ধারিত ছিল। ফলে প্রণালী বন্ধ বা আংশিকভাবে ব্যাহত হলে সবচেয়ে বড় ধাক্কা লাগবে এশীয় অর্থনীতিগুলোতে।

বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, অল্প সময়ের জন্যও যদি জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়, তবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের দাম দ্রুত বেড়ে যেতে পারে। এর প্রভাব পড়বে আমদানি-নির্ভর দেশগুলোতে, বিশেষ করে দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ায়।

বিকল্প পথ ও সীমাবদ্ধতা

EIA জানিয়েছে, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের কাছে বিকল্প পাইপলাইন অবকাঠামো রয়েছে, যা প্রতিদিন প্রায় ২.৬ মিলিয়ন ব্যারেল পর্যন্ত পরিবহন করতে পারে। তবে সেটি পূর্ণ সক্ষমতায় সচরাচর পরিচালিত হয় না এবং পুরো হরমুজ নির্ভর রপ্তানির ক্ষতি পূরণ করার মতো যথেষ্ট নয়।

অন্যদিকে, হরমুজ দিয়ে ইরানের নিজস্ব তেল রপ্তানিও হয়। ফলে দীর্ঘমেয়াদি অবরোধ ইরানের অর্থনীতিতেও চাপ সৃষ্টি করবে, বিশেষ করে যখন দেশটি আগে থেকেই কঠোর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মুখে রয়েছে।

সামরিক উত্তেজনার ইতিহাস

হরমুজ প্রণালী কার্যত নিয়ন্ত্রণ করে ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড কর্পসের নৌবাহিনী। অতীতে একাধিকবার এই জলপথে জাহাজ আটক, ড্রোন ভূপাতিত ও ট্যাঙ্কার জব্দের ঘটনা ঘটেছে। ১৯৮০–৮৮ সালের ইরান–ইরাক যুদ্ধের সময় “ট্যাঙ্কার যুদ্ধ” নামে পরিচিত অধ্যায়ে ৫০০-র বেশি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছিল।

১৯৮৮ সালে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস স্যামুয়েল বি. রবার্টস একটি সামুদ্রিক মাইনে আঘাত পায়। একই বছর জুলাইয়ে ইরান এয়ারের একটি এয়ারবাস এ৩০০ মার্কিন ফ্রিগেট ইউএসএস ভিনসেনেস থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রে ভূপাতিত হয়, এতে ২৯০ জন নিহত হন।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও উত্তেজনা থামেনি। ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে আসার পর জলপথে একাধিক ঘটনা ঘটে। ২০২১ সালে ওমান উপসাগরে একটি তেল ট্যাঙ্কারে হামলায় দুজন নিহত হন। ২০২৪ সালের এপ্রিলে ইরান হরমুজের কাছে একটি পর্তুগিজ পতাকাবাহী কন্টেইনার জাহাজ আটক করে।

বর্তমান প্রেক্ষাপট

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শুরুতেও একটি মার্কিন তেল ট্যাঙ্কারকে থামার নির্দেশ দেওয়ার ঘটনা ঘটে, যদিও মার্কিন নৌবাহিনীর পাহারায় সেটি যাত্রা অব্যাহত রাখে।

বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক যৌথ হামলার পর হরমুজ প্রণালী ঘিরে উত্তেজনা নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। এখন প্রশ্ন, এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ খোলা থাকবে নাকি আঞ্চলিক সংঘাত বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে বড় ধরনের ধাক্কা দেবে। পরিস্থিতি কোন দিকে গড়ায়, তার ওপর নির্ভর করছে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বিশ্ব অর্থনীতিরও স্থিতিশীলতা।